রাজাকারের ছলনায় বন্দি, মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে ফিরে আসা

বিজয় মজুমদার

হায়েনার খাঁচায় মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল্লাহ মজুমদার

(পর্ব ৫ ও ৬ )

১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে অস্ত্র ছিল অল্প। কিন্তু যে শক্তি তাঁদের ছিল, তা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ছিল না—অদম্য মনোবল। একটি দেশকে স্বাধীন করার জন্য বুকের রক্ত ঢেলে দেওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাই ছিল তাঁদের আসল সম্বল।

ভারতের কাছ থেকে পাওয়া অস্ত্র আর পাকিস্তানিদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া অস্ত্র নিয়েই মুক্তিযোদ্ধারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাদের নাস্তানাবুদ করে ছাড়েন। ফেনীর বিলোনিয়া লাইন সচল রাখার জন্য পাকিস্তানি সেনারা বহুবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। যদিও ফেনী শহরে তারা একটি শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলে, শহরের বাইরের বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

দিনের বেলা কখনো কখনো পাকিস্তানি সেনারা গ্রামে টহল দিলেও রাত নামলেই তারা পিছু হটত। কারণ ফেনী–ফুলগাজী–পরশুরাম–বিলোনিয়া সড়ক তখন ছিল দুর্গম, আর গ্রামের ভেতরে ঢোকা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। রাতের অন্ধকারে কখন, কোন দিক থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ আসবে—সে আতঙ্কই ছিল তাদের প্রধান ভয়।

এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানি বাহিনী ভিন্ন কৌশল নেয়। সারা বাংলাদেশের মতো ফেনী অঞ্চলেই তারা গড়ে তোলে রাজাকার বাহিনী—যারা বাঙালি হয়েও পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করত।

রাজাকারের হাতে ধরা

১৯৭১ সালের ২ ডিসেম্বর, দুজন সঙ্গীসহ রাজাকার বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল্লাহ মজুমদার। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সেদিনটি ছিল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে অন্ধকার দিনগুলোর একটি। চাঁদের আলো যেমন অন্ধকার ঢাকতে পারে না, তেমনি সে সময় মুক্তিযোদ্ধারাও নিজেদের পরিচয় পুরোপুরি লুকিয়ে রাখতে পারতেন না। গ্রামের মানুষ কোনো না কোনোভাবে জেনে যেত—কে মুক্তিযোদ্ধা।

শহীদের বড় বোনের বাড়ি তাঁর নিজের বাড়ি থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের পথ। সেদিন অস্ত্র হাতে একদল লোক এসে তাঁর বড় বোনকে জানায়, তারা মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদের সঙ্গী। জরুরি প্রয়োজনে শহীদকে খুঁজছে তারা। তাদের ধারণা ছিল, শহীদ হয়তো নিজের বাড়ির বদলে বোনের বাড়িতে অবস্থান করছেন।

এই কথা শুনে বড় বোন আনন্দিত হয়ে তাঁদের আপ্যায়ন করেন। তারা বলে, ‘শহীদ আমাদের ভাই। আপনি তাঁর বড় বোন, আপনিও আমাদের বড় বোন।’ বাস্তবে বড় বোন সেদিন জানতেন না শহীদ কোথায়। তাই তিনি সত্যিই বলেন, জানলে তিনি তাঁদের জানাতেন। কিছুক্ষণ পর তারা চলে যায়।

কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তারা আবার ফিরে আসে, সঙ্গে দুজন যুবক। একজনকে দেখে বড় বোন বিস্ময়ে বলে ওঠেন, ‘ভাই, কতদিন পরে তোকে দেখলাম!’ এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই অস্ত্রধারীরা গামছা দিয়ে শহীদ ও তাঁর সঙ্গীর চোখ বেঁধে ফেলে। হতভম্ব বড় বোনের চোখের সামনেই তাঁদের টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায়।

সেদিন রাতে শহীদের পরিবার যখন খাবার খেতে বসেছে, দূর থেকে শোনা যায় বুকফাটা আর্তনাদ—
“ও আব্বা, শহীদকে তো ধরে নিয়ে গেল!”

এরপর কয়েক দিন পরিবারটির ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া পর্যন্ত হয়নি।

রাজাকার বেশে মুক্তিযোদ্ধা

সেদিন মুক্তিযোদ্ধার পরিচয়ে যারা এসেছিল, তারা আসলে ছিল রাজাকার। নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিয়ে গ্রামের মানুষদের বিশ্বাস অর্জন করেছিল তারা। ফলে শহীদের বড় বোনের পক্ষে বোঝার কোনো উপায় ছিল না যে তারা শত্রুপক্ষের লোক।

তিনি এতটাই আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করেছিলেন যে রাজাকারদের দলনেতা বলেছিল, ‘আপনি আমার বড় বোনের মতো।’ কিন্তু সেই ‘ভাই’ যখন তাঁর চোখের সামনে নিজের ভাইকে চোখ বেঁধে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, তখনই তিনি বুঝতে পারেন—এরা কারা।

আজীবন তাঁর সবচেয়ে বড় কষ্ট ছিল এই ভাবনা—তিনি যদি সেদিন ভাইকে জড়িয়ে না ধরতেন, তবে হয়তো রাজাকাররা বুঝতেই পারত না, কাকে তারা ধরে এনেছে।

বিড়ির আগুন

শহীদের বড় বোনের বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাজাকাররা মুহুরি নদীর পাড় ধরে এগোচ্ছিল। হঠাৎ অন্ধকারে তারা আগুনের একটি রেখা দেখতে পায়—বিড়ির আগুন। তারা আন্দাজ করে, বিপরীত দিক থেকে কেউ আসছে। অস্ত্র উঁচিয়ে তারা ‘হল্ট’ বলে চিৎকার করে।

সঙ্গে সঙ্গে তিন যুবকের একজন ধানক্ষেতে লাফ দেয়। রাজাকাররা ধানক্ষেত লক্ষ্য করে ব্রাশ ফায়ার করে। বাকি দুজন হতভম্ব হয়ে পড়ে। তাদের ধরে আবার বড় বোনের বাড়িতে আনা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, তারা গ্রামের সাধারণ যুবক, আর তাদের সঙ্গী ভয় পেয়ে পালিয়েছে।

তবু সন্দেহ দূর না হওয়ায় দুজনকে চোখ বেঁধে ফুলগাজী সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়।


ফিরে আসা শহীদ ও অর্জিত বিজয়

(পর্ব ৬)

২ ডিসেম্বরের পর শহীদুল্লাহ মজুমদারকে খুঁজে পাগলের মতো ঘুরতে থাকেন তাঁর বাবা ও ভাইরা। কেউ জানত না, কেউ বলতেও পারছিল না—তাঁকে কোথায় রাখা হয়েছে।

৫ ডিসেম্বর শহীদের পিতা প্রথম নিশ্চিত হন, শহীদুল্লাহ মজুমদার ফুলগাজী আর্মি ক্যাম্পে বন্দি। প্রবীণ এই মানুষটি সেদিনই সাহস নিয়ে ক্যাম্পে হাজির হন। ক্যাম্প কমান্ডার তাঁর সাহসে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, তিনি কীভাবে খবর পেলেন।

হেডমাস্টার হাসমত উল্লাহ উত্তর দেন, ‘আপনারা যাকে মুক্তিবাহিনীর সন্দেহে আটক করে পরে ছেড়ে দিয়েছেন—সেই জাফরের কাছ থেকে।’

২ ডিসেম্বর রাতে যে তিনজন যুবক বিড়ি খেতে খেতে নদীর পাড় ধরে যাচ্ছিলেন, তাঁদের একজন ধানক্ষেতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। বাকি দুজনের একজন ছিলেন শহীদুল্লাহ মজুমদার, অন্যজন জাফর। জাফর মুক্তিযোদ্ধা নন—এ কথা জানার পর পাকিস্তানিরা তাঁকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু শহীদের কাছ থেকে তথ্য আদায়ের জন্য চালানো হয় নির্মম নির্যাতন।

শেষ পর্যন্ত তারা যখন বুঝতে পারে, শহীদ মৃত্যুবরণে প্রস্তুত, কিন্তু মুখ খুলবেন না—তখন তাঁকে বন্দুকের নলের সামনে দাঁড় করানো হয়। কিন্তু যিনি গুলি করার কথা, সেই সুবেদার মেজর তিনবার চেষ্টা করেও গুলি করতে পারেন না। জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘এই ছেলেটি দেখতে একদম আমার মৃত ভাইয়ের মতো।’

সেই সুবেদারের অনুরোধে শহীদের জীবন ভিক্ষা দেওয়া হয়। দুজন রাজাকারকে সঙ্গে দিয়ে তাঁকে বাড়ি পাঠানো হয়। কিন্তু পথেই শহীদ কৌশলে পালিয়ে আবার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেন। দিনটি ছিল ৫ ডিসেম্বর ১৯৭১।

এই খবর অবশ্য তখনও জানতেন না হেডমাস্টার হাসমত উল্লাহ। ফুলগাজী ক্যাম্প থেকে ফিরে আসার পরদিন, ৬ ডিসেম্বর, ছিল তাঁর জীবনের এক ঐতিহাসিক দিন। সেদিন যৌথ বাহিনীর হাতে ফেনীর পতন ঘটে—ফেনী মুক্ত হয়।

বিষাদ আর আনন্দ মিলিয়ে সেই দিনটি পরিণত হয় এক উৎসবে।

মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল্লাহ মজুমদার মুক্ত ফেনী ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন অপারেশন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করেন। নির্যাতনের কারণে শারীরিকভাবে সুস্থ হতে তাঁর কয়েক মাস লেগে যায়। সেই আঘাতের যন্ত্রণা তিনি বহন করেছেন দীর্ঘদিন। তবে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১—বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয়ের দিন—সব বেদনা যেন সেদিন ধুয়ে-মুছে যায়।

স্বাধীন দেশের শহীদুল্লাহ মজুমদার

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শহীদুল্লাহ মজুমদার আবার পড়ালেখায় ফিরে যান। কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। যে বছর এলএলএম চালু হয়, তিনি ছিলেন সেই ব্যাচের ছাত্র। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও আত্মীয় গোলাম মুর্তজা মজুমদারও ছিলেন একই ব্যাচে।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে তিনি আইন পেশায় যুক্ত হন এবং আজীবন সততা, সুনাম ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি ফেনীর আনন্দপুর ইউনিয়নের হাসানপুর গ্রামের কাউসার বেগমকে বিয়ে করেন। তাঁদের তিন সন্তান—এক ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় ছেলে এমবিএ শেষ করে ব্যবসায় যুক্ত। বড় মেয়ে চিকিৎসক এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল। ছোট মেয়ে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার ও কানাডা প্রবাসী।

২০২৩ সালের ১০ আগস্ট, স্বাধীন দেশের মাটিতেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল্লাহ মজুমদার। তাঁকে বনানী সামরিক কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

এই গল্প কেবল একজন মানুষের নয়—এটি এক জাতির অদম্য সাহস, বিশ্বাসঘাতকতার অন্ধকার আর বিজয়ের আলোয় ফিরে আসার ইতিহাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *