২০২৫ সালে কর্মস্থলে প্রাণ গেল ১,১৯০ শ্রমিকের

“সকালে অফিসে গেলে মনে হতো, সন্ধ্যায় বাসায় ফিরব। আজ আমার লাশ যাবে।”
গত ১৪ অক্টোবর মিরপুরের একটি গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৯ বছর বয়সী রুমা আক্তারের এই শেষ কথাই আজ বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা। রুমা মারা যান আরও ১৫ সহকর্মীর সঙ্গে। সেদিন কারখানার সামনে মেয়ের ছবি হাতে কাঁদছিলেন তার মা হাসিনা বেগম। এমন দৃশ্য ২০২৫ সালজুড়ে বারবারই দেখা গেছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ অকুপেশনাল সেফটি, হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (OSHE) ফাউন্ডেশন-এর বাৎসরিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে কর্মস্থলে কমপক্ষে ১,১৯০ শ্রমিক নিহত হয়েছেন; আহত হয়েছেন ২২২ জন। আগের বছরের তুলনায় মৃত্যু বেড়েছে ২৮৫ জন—প্রায় ৩১.৫ শতাংশ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংঘটিত কর্মস্থল দুর্ঘটনার ৮৪.৩ শতাংশই প্রাণঘাতী ছিল। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৮০.৬ শতাংশ। অর্থাৎ দুর্ঘটনার পর বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা আরও কমছে। OSHE এর জন্য দায়ী করছে দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থা, দেরিতে উদ্ধার এবং জরুরি চিকিৎসার ঘাটতিকে।

কোথায় বেশি ঝুঁকি

সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে—

  • পরিবহন খাতে: ৩৮%
  • শিল্প ও উৎপাদনে: ২২%
  • সেবা খাতে: ১৪%
  • কৃষিতে: ১১%
  • নির্মাণে: ৮%

মৃত্যুর প্রধান কারণ সড়ক দুর্ঘটনা (৪১%), বিদ্যুৎস্পৃষ্ট (১৭%), উচ্চ স্থান থেকে পতন (১৪%) ও অগ্নিকাণ্ড-বিস্ফোরণ (১০%)। দুর্ঘটনার ৮৪ শতাংশই ঘটেছে অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে শ্রম আইনের বাস্তব প্রয়োগ প্রায় নেই।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে মৃত্যুর সংখ্যা দেখানো হয়েছে ৪২৭—OSHE-এর হিসাবের এক-তৃতীয়াংশেরও কম। গবেষকদের মতে, অনানুষ্ঠানিক খাতের তথ্য না থাকায় সরকারি হিসাব বাস্তব চিত্র প্রতিফলিত করে না।

ব্রিটিশ ম্যাগাজিন Health & Safety International চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি শিরোনাম করে জানায়: “Workplace death toll hits 1,190 in Bangladesh in 2025” প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে “sharp deterioration” বলে উল্লেখ করেছে।

BUET-এর দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের ড. শাহাদৎ হোসেন বলেন,“জাতীয় দুর্ঘটনা ডেটাবেস না থাকায় নীতিনির্ধারকেরা ঝুঁকির মাত্রা বুঝতে পারছেন না।”

শ্রম অধিকার ফোরামের সেলিনা বানুর মতে, “নিরাপত্তা কমিটি আইনত বাধ্যতামূলক হলেও অধিকাংশ কারখানায় এটি নেই।”

রানা প্লাজা ধসের এক যুগ পরও কর্মক্ষেত্রে মৃত্যু থামেনি। ১,১৯০টি পরিবার আজ শুধু শোকাহত নয়—তারা সাক্ষ্য দিচ্ছে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতার।

প্রশ্নটা এখন আর পরিসংখ্যানের নয়—
আর কত প্রাণ গেলে কর্মস্থল নিরাপদ হবে?

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *