মারুফ আহমেদ
শীত। হাড়কাঁপানো প্রকৃতির সজীবতায় আমাদের দেশের ছয় ঋতুর এক আলাদা বৈশিষ্ট্য। এ সময় দেশি পাখপাখালিরা ঘন কুয়াশার চাদরে প্রচণ্ড শীতে জবুথবু হয়ে পড়ে। গাছের আবরণে ঘাপটি মেরে থাকে। দেশের বিভিন্ন প্রজাতির বকের পাশাপাশি অতিথি পাখিদের বিচরণ দেখা যায় সবুজের বুকে, খাল-বিলে। তারা খাবার খেতে আসে।
ভাগ্যের বিড়ম্বনায় এসব নিরীহ পাখিরা এক শ্রেণীর নিষ্ঠুর মানুষের শিকারে পরিণত হয়। শুধু তাই নয়, আরও এক শ্রেণীর মানুষরূপী পশুখাদকের মজাদার রান্নার আহারে পরিণত হয়ে পড়ছে। ঢাকার ৩০০ ফিট, নীলা মার্কেটসহ বেশ কিছু রেস্তোরায় সোশ্যাল মিডিয়াসহ সর্বত্র ঘোষণাসহ দেশীয় পাখির মাংস হরদম বিক্রি চলছে। ভ্রমণপিপাসুরাও থেমে নেই এই ভোজনে। অসাধু শিকারীচক্রদের এখনই চিহ্নিত করতে না পারলে, আমাদের পরিযায়ী পাখিরা বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাবে।
মনটা ভালো হয়—এখনও শহরজুড়ে ছোট ছোট ডোবা-নালায় সাদা বকের সারি চোখে পড়ে। তাদের নির্ভয়ে খাবার সংগ্রহের জন্য মানুষের সৃষ্ট সব ভয় দূর করতে হবে এবং তাদের বিচরণভূমি ভূমিদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। শহরের জীবিত ও মৃত খালসমূহ পরিষ্কার রাখা সবচেয়ে জরুরি। ওরা নালা, খাল-বিলে শামুক, পোকামাকড় ও ছোট মাছ খেতে আসে। সবার আগে শিকারীদের দৌরাত্ম বন্ধ করতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে সুস্থ, পরিবেশপ্রিয় সবুজপ্রেমী তরুণদের। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে খাল-বিলের নোংরা ময়লা-আবর্জনা-পলিথিন পরিস্কার করাটাও খুব জরুরি।
মুগদা-মান্ডা মহাসড়ক আমিন মোহাম্মদ সংলগ্ন খাল এবং উত্তরা ১৫-১৬ নম্বর সেক্টরের মাঝ বরাবর কবরস্থানের খালে সরজমিনে এখনও দেশীয় বকের বিচরণ দেখা গেছে। কিন্তু শহরের অনেক বিল-ঝিল চলে যাচ্ছে ভূমি লর্ডদের বাণিজ্যিক প্রস্তাবনার প্লটবাণিজ্যে—কিংবা তাদের নিজস্ব রাস্তার নামে। নিদর্শন হিসেবে রয়েছে—শেখের জায়গা থেকে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার মূল সড়কের আমিন মোহাম্মদ প্রকল্প, মুগদার গ্রীন মডেল টাউন, কোনা পাড়ার ধার্মিকপাড়ার মিনি কক্সবাজার এলাকা, সদ্য ভরাট হওয়া আশিয়ান সিটির ভূমি ব্যবসায়ীদের গড়া এয়ারপোর্ট—হাজীক্যাম্প—কাওলা বাজার পেরিয়ে আশকোনা থেকে আশিয়ান ইউনিভার্সিটি সড়ক। এই সড়কের কাজ সরজমিনে দেখা গেছে এখনও চলমান। এর দুই পাশে এখনও দু-একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন ফাঁকা জলাশয় আছে। যে জলাশয়গুলোও হয়তো একদিন ভরাট হবে। গড়ে তোলা হবে সুউচ্চ অট্টালিকা। সুরম্য প্রাসাদ। এভাবেই সবুজ নগরীটি একদিন হারিয়ে যাবে আমাদের চোখের সামনে।
আর সরকারি খালগুলোর কথা বললে—সেগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়। রাজধানীর এসব খাল-বিল এখনও অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় পড়ে আছে। খাল-বিলের নোংরা পরিবেশ পরিষ্কার করে পানির স্বাভাবিক স্রোতধারা সৃষ্টি করতে পারলে শহরে পরিযায়ী পাখির বিচরণ আরও বাড়বে। তাদের নিরাপদ বসবাসে ঢাকার বিভিন্ন কবরস্থানে গাছ রোপণও উপকারী হবে। দিনের বেলায় তারা খাল-বিলে খাবার সংগ্রহ করে। সন্ধ্যার পূর্বক্ষণে যে যার ঘরে ফিরে যায়। শহরের উঁচু বড় গাছগুলোই তাদের নিরাপদ আবাসন।