২০২৩ সালের শুরুতে ইরানের সাবেক শাহ এর ছেলে রেজা পাহলভি প্রকাশ্যে ইসরায়েল সফর করেন। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে শাহ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাঁরা নির্বাসনে চলে যান। প্রবাসী ইরানিদের মধ্যে পাহলভি কিছুটা জনপ্রিয় হলেও, দেশের ভেতর তাঁর নেতৃত্ব গ্রহণযোগ্য হবে—এটা নিশ্চিত নয়। কারণ তাঁর পরিবার একসময় আমেরিকা–ইসরায়েল-সমর্থিত স্বৈরশাসনের প্রতিনিধিত্ব করেছিল।
ইসরায়েল সফরের সময় গামলিয়েল নামের মন্ত্রী সফরটিকে ‘অফিসিয়াল ভিজিট’ বলেন। সংবাদমাধ্যম আলোড়িত হয়। ইসরায়েলি মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়—ইরানিদের শত্রু ইসরায়েল নয়; শত্রু তেহরানের শাসকগোষ্ঠী।
প্রবাসী ইরানিদের একাংশের কাছে পাহলভির গ্রহণযোগ্যতা আছে। কিন্তু ইরানের ভেতরের সমাজে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তিনি একজন প্রাক্তন স্বৈরশাসকের ছেলে—যার শাসনব্যবস্থায় আমেরিকা ও ইসরায়েলের সমর্থন ছিল, আবার ছিল রাজনৈতিক নিপীড়ন, দুর্নীতি ও বিরোধীদের ওপর দমন। এসব অতীত কি নতুন নেতৃত্বের পথে বাধা হবে, নাকি তাঁর গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বক্তব্য তা কাটিয়ে উঠবে—প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।
ইসরায়েলের মন্ত্রী গামলিয়েলের সঙ্গে করা সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়—ইরানিরা কীভাবে আয়াতুল্লাদের শাসন উত্খাত করবে। তিনি উদাহরণ দেন পোল্যান্ডের ওয়ালেসা ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যান্ডেলার অহিংস আন্দোলনের। বলেন—যে বিজয়গুলো আন্তর্জাতিক সমর্থন ছাড়া সম্ভব হতো না। এই ব্যাখ্যায় তিনি নিজের সফরের নৈতিকতা ও উদ্দেশ্যও বুঝিয়ে দেন।
সাংবাদিকেরা জানতে চান—ইসরায়েল সফরে ইরানিদের প্রতিক্রিয়া কেমন। তাঁর দাবি—বেশির ভাগ প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক। তিনি বলেন—“আমার কথায় বিশ্বাস করবেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখুন।”
এই মন্তব্যই পরবর্তী পর্যায়ে চলে যায় ডিজিটাল অনুসন্ধানের জটিল ভুবনে।
—তার সফরের পর পরই ইরানের বিরুদ্ধে ফার্সি ভাষায় বড়সড় ডিজিটাল প্রচারণা শুরু হতে দেখা যায়। হা’আরেতজসহ কয়েকটি সংস্থার অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রচারণার কেন্দ্র ছিল ইসরায়েলের ভেতরে এবং অর্থায়ন আসে এমন প্রতিষ্ঠান থেকে যাদের সাথে সরকারের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে।
নেটওয়ার্কটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে সামাজিক মাধ্যমে পাহলভির ভাবমূর্তি উঁচু করে তুলে ধরে এবং রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার স্লোগান ছড়ায়। ফার্সির পাশাপাশি ইংরেজি ও জার্মান ভাষায় প্রচারণা চলে। গবেষকদের ভাষ্য মতে—এই প্রচারণায় এআই-তৈরি ভিডিও, ভুয়া প্রোফাইল ছবি ও বট ব্যবহৃত হয়। বহু অ্যাকাউন্ট ২০২২–২৩ সালে খোলা হয় এবং যা ছিল ‘হিজাব বিক্ষোভ’ ও পরে ইরান–ইসরায়েল সংঘাতের সময় খুবই সক্রিয়।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সিটিজেন ল্যাব একই সময়ে আরও একটি ফার্সি ভাষার প্রো–ইসরায়েল নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে। গবেষকদের মতে—এটি সম্ভবত ইসরায়েলি সরকারের বা তাদের হয়ে কাজ করা কোনো ঠিকাদারের পরিচালিত অপারেশন। কারণ নেটওয়ার্কের কনটেন্টের সময় ও ভাষা মিলে যায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে।
সবচেয়ে আলোচিত ছিল ইরানের বিখ্যাত ইভিন কারাগারে হামলার সময়কার প্রচারণা। হামলার খবর প্রকাশের আগেই নেটওয়ার্ক অ্যাকাউন্টগুলো বিস্ফোরণের কথা বলা শুরু করে এবং খুব দ্রুত—এআই দিয়ে তৈরি এক ভিডিও ছড়িয়ে দেয়, যা অনেক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও প্রকাশ করে। পরে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়—ভিডিওটি ছিল নকল। প্রচারণার উদ্দেশ্য ছিল ইরানের ভেতর অস্থিরতা তৈরি এবং জনগণকে বিদ্রোহে উসকে দেওয়া।
গবেষকদের প্রশ্ন—ইসরায়েল প্রকাশ্যে পাহলভির পাশে দাঁড়িয়ে আসলে কি হাসিল করতে চায়? কারণ ইরানের সাধারণ জনগণের ভেতরে পাহলভির প্রতি সমর্থন নাই বললেই চলে। বরং এমন প্রচেষ্টা খামেনির সেই বক্তব্যকে প্রমাণ দেয় যে বিদেশি শক্তি ইরানকে আবার ‘রাজতন্ত্রের করদ রাজ্যে’ পরিণত করতে চায়।