বিজয় মজুমদার
পেট কোনো কাজ করে না—এমন একটি গল্প আছে। গল্পটি বহু বছর আগে ইশপ লিখেছিলেন। সারকথা হচ্ছে, শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ একদিন সিদ্ধান্ত নেয় যে সবাই কাজ করে, কিন্তু পেট শুধু খায়। তাই তারা আর পেটকে কোনো সাহায্য করবে না।
পা খাবারের জন্য নড়বে না, হাত সেই খাবার মুখের কাছে আনবে না, মুখ খাবার গ্রহণ করবে না, দাঁত খাবার কাটবে না এবং খাদ্যনালী সেই খাবার পেটে নিয়ে যাবে না।
এই সিদ্ধান্তে পেট বয়কট হলো। পেট আর কোনো খাবার পেল না। কিন্তু দুদিন না যেতেই শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। হাত নড়াচড়ার শক্তি হারায়, পা-ও অক্ষম হয়ে পড়ে, মুখের খাবার গ্রহণের শক্তিও থাকে না। প্রায় মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে তখন ব্যক্তিটি পাকে খাবারের কাছে যেতে বাধ্য করে। হাত আর কোনো কথা বলে না, বাকীরাও বুঝে ফেলে—পেটে খাবার না গেলে শরীর টিকবে না।
বাংলাদেশ ক্রিকেটে সাম্প্রতিক ঘটনাটি অনেকটা সেই গল্পের মতো। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের এক কর্মকর্তা সরাসরি ক্রিকেটারদের সঙ্গে বড় ধরনের বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর বক্তব্য—ক্রিকেটারদের কথা না শুনলেও চলবে, ক্রিকেটাররা দেশকে কিছু দেয়নি, আর বিসিবি ধনী বলে ক্রিকেটারদের খেলায় যে অর্থ ব্যয় হয়, তাতে ক্রিকেটারদের কোনো অবদান নেই।
এই বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে ক্রিকেটাররা বিপিএল বয়কটের ঘোষণা দেয়। বিতর্কের ইতি টানতে আপাতত বিসিবি ওই কর্মকর্তাকে বিদায় দিয়েছে। তবে ভারতবিরোধী মনোভাব এখন তুঙ্গে থাকায় ক্রিকেটারদের বক্তব্য অনেকে শুনতে বা বুঝতে চাইছে না।
ভারতে না গেলে বিশ্বকাপ খেলা না হওয়ার ঝুঁকি আছে। সে ক্ষেত্রে আর্থিক ক্ষতি হবে, কারণ বিশ্বকাপের জন্য আইসিসির প্রাইজমানি রয়েছে।
বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশকে বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করে ক্রিকেটাররাই। শুধু তাই নয়, এ পর্যন্ত বিশ্বকাপের মঞ্চে পাকিস্তান ও ভারত—উভয় দলকেই তারা হারিয়েছে।
বাংলাদেশের কোনো বোর্ডের দেরাজে যে একমাত্র বিশ্বকাপটি সাজানো আছে সেটিও ক্রিকেটের এনে দেওয়া—অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপ। ২০২০ সালে বাংলাদেশ এই শিরোপা জেতে, আর ফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল ভারত।
তারপরও কি বিশ্বাস করা যায় যে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের অর্জন শূন্য?
ক্রিকেটাররা আমাদেরই সন্তান। তাদেরকে ‘জাতীয় শত্রু’ বানানোর ধারণা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। মনে রাখতে হবে—পেটে খাবার না গেলে শরীর কাজ করে না, তেমনি ক্রিকেটাররা না খেললে ক্রিকেটের বাকী সংগঠনও কার্যকর থাকবে না।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের সামনে পথ আরও দীর্ঘ। ক্রিকেটারদের মধ্যে সেই বিশ্বাস গড়ে তুলতে হবে। জুনিয়ররা যেমন বিশ্বকাপ জিতেছে, একদিন সিনিয়ররাও সেটি জিতবে।
আমরা যেন আমাদের ক্রিকেটারদের প্রতি সেই বিশ্বাস রাখতে পারি।