২১শে জানুয়ারি থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিতাদেশ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশনায় ৭৫টি দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে। এই সিদ্ধান্তকে ট্রাম্প প্রশাসন ব্যাখ্যা করছে দেশের করদাতাদের স্বার্থ রক্ষার উদ্যোগ হিসেবে। তাদের বিশ্বাস, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকারী অভিবাসীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হতে হবে এবং সরকারি ভাতা বা কল্যাণমূলক সহায়তার ওপর নির্ভর করা যাবে না।
স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, ‘পাবলিক চার্জ’ নীতির আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিবাসী ভিসা কার্যক্রম পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই—ভবিষ্যতে সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে এমন অভিবাসন প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা।
কাদের ক্ষেত্রে এই স্থগিতাদেশ প্রযোজ্য
এই সিদ্ধান্ত শুধু অভিবাসী ভিসার ওপর প্রযোজ্য। অর্থাৎ কর্মসংস্থানভিত্তিক ও পারিবারিক অভিবাসন উভয়ই এর আওতায় আসবে। আবেদনকারীরা আবেদন ও সাক্ষাৎকার দিতে পারবেন, কিন্তু নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত দেশের জন্য ভিসা ইস্যু আপাতত স্থগিতই থাকবে।
এখানে ভ্রমণ, পর্যটন, ব্যবসা বা শিক্ষার উদ্দেশ্যে দেওয়া নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাগুলোর ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আসছে না। বি-১/বি-২, এফ-১ বা অন্যান্য শিক্ষার্থী ভিসা, ব্যবসায়িক ভিসা বা পর্যটক ভিসা স্বাভাবিক নিয়মেই চলবে।
কাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়
স্টেট ডিপার্টমেন্ট আরও স্পষ্ট করেছে—যাদের হাতে ইতিমধ্যে বৈধ ইমিগ্র্যান্ট ভিসা রয়েছে, তাদের ভিসা বাতিল বা স্থগিত করা হবে না। এই সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র নতুন ভিসা ইস্যুকে কেন্দ্র করে।
এ ছাড়া দ্বৈত নাগরিকরা যদি এমন দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করেন যে দেশ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় নেই, তবে তারা স্থগিতাদেশের বাইরে থাকবেন।
কেন এমন নীতি
এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে রয়েছে ‘পাবলিক চার্জ’ বা সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হওয়া সংক্রান্ত নীতি। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসীদের খাদ্যসহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসনসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তামূলক সুবিধা দিয়ে এসেছে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি—অভিবাসীরা যদি এসব সহায়তার ওপর দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরশীল হন, তবে তা মার্কিন করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র টমি পিগট বলেছেন, নতুন নীতিতে আবেদনকারীর বয়স, স্বাস্থ্য, ভাষাজ্ঞান, আয়, আর্থিক সুরক্ষা এবং অতীত কল্যাণ সুবিধা গ্রহণের ইতিহাস বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। লক্ষ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর কেউ যেন সরকারি ভাতা বা কল্যাণমূলক স্কিমে নির্ভরশীল হয়ে না পড়েন।
সম্প্রতি মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের একটি সরকারিভিত্তিক সহায়তা কর্মসূচিতে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে। ঘটনাটি ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে—যে কিছু অভিবাসী সামাজিক সহায়তার ফাঁকফোকর ব্যবহার করছেন এবং এতে রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
প্রেক্ষাপট ও বিতর্ক
ইমিগ্রেশন নীতি যুক্তরাষ্ট্রে সবসময়ই রাজনৈতিক তর্কের কেন্দ্রবিন্দু। অর্থনীতি, নিরাপত্তা, জনসংখ্যা কাঠামো, শ্রমবাজার এবং কল্যাণমূলক ব্যয়—সব কিছু মিলেই বিষয়টি জটিল। ট্রাম্প প্রশাসন আগে থেকেই সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, ভিসা যাচাই এবং আশ্রয় প্রার্থীদের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থানের পরিচয় দিয়েছে। ‘পাবলিক চার্জ’ নীতিও তারই ধারাবাহিকতা।
সমালোচকদের মত—এতে নিম্ন ও মধ্য আয়ের অভিবাসীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। যেসব পরিবার আত্মীয়দের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল, তাদের পথ অনেক কঠিন হয়ে যাবে। এমনকি দক্ষ কর্মীদের ক্ষেত্রেও আর্থিক মূল্যায়ন কঠোর হওয়ায় অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
সমর্থকদের মতে—দেশটি এমন অভিবাসীদেরই গ্রহণ করবে যাদের প্রবেশে শ্রমবাজার শক্তিশালী হবে এবং যারা নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি
স্থগিতাদেশ কতদিন বহাল থাকবে, তা স্পষ্ট নয়। স্টেট ডিপার্টমেন্ট বলছে, ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত’। অর্থাৎ কূটনৈতিক আলোচনা, অভিবাসন নীতির পর্যালোচনা এবং অর্থনৈতিক মূল্যায়নের ওপর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় এটি বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। যদি ‘পাবলিক চার্জ’ নীতি বিস্তৃতভাবে প্রয়োগ হয়, তবে অভিবাসী সম্প্রদায়, আইনি পরামর্শদাতা এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ওপর বহুস্তরের চাপ তৈরি হবে।