দীর্ঘ এক যুগের ধীরগতি ও নেতিবাচক সংবাদ পেরিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনীতি এখন নতুন করে গতি খোঁজার চেষ্টা করছে। দেশটির রাষ্ট্রপতি সিরিল রামাফোসার সরকার এবং ব্যবসায়ী মহলের অনেকেই আশাবাদী—আগামী তিন বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমপক্ষে ৩ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে। তাদের মতে, বিনিয়োগ, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের সংস্কার এবং রপ্তানি বাজারে ইতিবাচক অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর হিসাবটা একটু সতর্ক রেখেছে। তাদের মতে, বিদ্যুৎ-সংকট ও বেকারত্ব দ্রুত কমানো না গেলে প্রবৃদ্ধি দুই শতাংশের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত।
২০০৫ সালের পর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতি মাথা জিডিপি ক্রমাগত কমেছে। এখন তা প্রায় ২০ বছর আগের তুলনায়ও কম পর্যায়ে। অর্থনীতিবিদরা এটিকে দেশের “হারানো দশক” বলে উল্লেখ করেন। তবুও সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ পর্যবেক্ষকদের আশাবাদী করেছে—বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতে নতুন বিনিয়োগ ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দেখা দেওয়ায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অগ্রগতি যদি স্থায়ী হয়, তবে শুধু দক্ষিণ আফ্রিকা নয়—পুরো আফ্রিকান অর্থনীতির ওপর এর বড় প্রভাব পড়বে, কারণ দক্ষিণ আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি।
দেশটির সবচেয়ে কঠিন সংকট হলো বেকারত্ব। বিশেষ করে তরুণদের এক-তৃতীয়াংশ এখনো কর্মহীন। সরকার মনে করছে—প্রবৃদ্ধি টেকসই হলে ২০২৯ সালের মধ্যে বেকারত্ব অন্তত পাঁচ পয়েন্ট কমানো সম্ভব। কিন্তু আইএমএফ বলছে—বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই অগ্রগতি খুব ধীর হবে।
দেশীয় ব্যবসায়ীরা দক্ষিণ আফ্রিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনও আশাবাদী। তারা খনিজ, নবায়নযোগ্য জ্বালানী, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত ও প্রযুক্তি খাতে বড় সম্ভাবনা দেখছেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও দক্ষিণ আফ্রিকা “আন্ডার-প্রাইসড”—অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদে ভালো রিটার্ন পাওয়ার সুযোগ আছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে সামনের পথ একেবারে মসৃণ নয়। বিদ্যুৎ সংকট পুরোপুরি শেষ হয়নি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি এখনও চাপ তৈরি করছে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাও কমেনি। তারপরও রামাফোসা প্রশাসন ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছে, খনিজ খাতে নতুন আইন আনছে এবং বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ খুলে দিচ্ছে—এসব পদক্ষেপকে অর্থনীতিবিদরা “উন্নতির আলামত” হিসেবে দেখছেন।
অর্থনৈতিক ইতিহাসের উদাহরণ বলছে—বেশিরভাগ বড় উত্থানই শুরু হয় হতাশার মধ্য থেকে। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষেত্রেও সেই মুহূর্ত হয়তো এখনো পুরোপুরি ধরা দেয়নি, তবে আলো দেখা যাচ্ছে। এখন প্রশ্ন—সংস্কারের গতি ধরে রাখা যাবে কি না। যদি যায়, তবে “হারানো দশক” শেষে নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।
কেপটাউনের এক তরুণ উদ্যোক্তার ভাষায়—“উন্নতির গতি ধীর, কিন্তু দিশা পরিষ্কার। এবার আমরা শুধু আশা নয়, পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছি।”