আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)-এ চলমান “গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তি সংক্রান্ত কনভেনশন প্রয়োগ” মামলার মূল শুনানিকে সামনে রেখে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে এক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মতবিনিময় সভা করেছে বাংলাদেশ দূতাবাস। মঙ্গলবার (২৭শে জানুয়ারী) সন্ধ্যায়, দ্য হেগে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রাঙ্গণে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বাংলাদেশ দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স অ্যাড ইন্টারিম মি. মো. হাসান আব্দুল্লাহ তৌহিদ। সভায় অংশ নেন দ্য গাম্বিয়ার আইনি দলের সদস্যরা, রোহিঙ্গা ভুক্তভোগী প্রতিনিধিদল, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক আইনের বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা।
সভায় মূলত আইসিজেতে চলমান দ্য গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার মামলার প্রেক্ষাপটে জবাবদিহি, ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ এবং রোহিঙ্গাদের জন্য টেকসই সমাধানের বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত ভয়াবহ মানবতাবিরোধী অপরাধের আন্তর্জাতিক বিচার নিশ্চিত করা শুধু রোহিঙ্গাদের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া রোহিঙ্গা ভুক্তভোগী প্রতিনিধিদলে ছিলেন নারী, পুরুষ এবং হিজড়া (ট্রান্সজেন্ডার ও ইন্টারসেক্স) সদস্যরা। তাঁরা সবাই ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘটিত সহিংসতার শিকার। বর্তমানে তাঁরা কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছেন। একই সঙ্গে তাঁরা ন্যায়বিচার ও লিঙ্গসমতার দাবিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন।
রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা তাঁদের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। আন্তর্জাতিক বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতাও তাঁরা শেয়ার করেন। তাঁদের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে—ভুক্তভোগীদের কথা শোনা, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং মানুষকেন্দ্রিক বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
অনুষ্ঠানে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়—
“From Atrocities to Survival: Justice Journey of Rohingya Victims”।
প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের পর রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনি বিশেষজ্ঞদের প্রাণবন্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
লিগ্যাল অ্যাকশন ওয়ার্ল্ডওয়াইড-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মিস অ্যান্টোনিয়া মালভে বলেন, গণহত্যা ও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার মানুষদের জন্য আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আদালতের কাছে ভুক্তভোগীদের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন।

দ্য গাম্বিয়ার আইনি দলের বিশেষজ্ঞরা আইসিজে মামলার মূল শুনানি পর্যায় নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। ফোলি হোগ এলএলপি-এর আইনজীবী মি. এম. আরসালান সুলেমান মামলার কাঠামো ও অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরেন। আর ১১ কিংস বেঞ্চ ওয়াক চেম্বার্স-এর আইনজীবী মি. পল এস. রাইখলার গণহত্যা কনভেনশনের আওতায় আদালতে উত্থাপিত যুক্তি এবং প্রার্থিত প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত জানান।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার উইংয়ের মহাপরিচালক মি. মো. কামরুজ্জামান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে বর্তমানে ১২ লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় ও সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও দ্রুত প্রত্যাবাসনের আহ্বান জানান এবং তাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
সমাপনী বক্তব্যে গণপ্রজাতন্ত্রী দ্য গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারমন্ত্রী হি. ই. মি. দাউদা জাল্লো বলেন, রোহিঙ্গাদের পক্ষে আন্তর্জাতিক আদালতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে গাম্বিয়া অটল। তিনি জানান, এই লড়াই দীর্ঘ হলেও আন্তর্জাতিক সংহতি ধরে রাখাই সাফল্যের চাবিকাঠি।