মারুফ আহমেদ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা–৯ আসন (সবুজবাগ, খিলগাঁও ও মুগদা) থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী বিএনপি মনোনীত তিন প্রধান প্রার্থী নিজ নিজ নির্বাচনী ইশতেহার উপস্থাপন করেছেন। ৩১ জানুয়ারি শনিবার দুপুরে রাজধানীর খিলগাঁও মডেল কলেজে সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে আয়োজিত ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে প্রার্থীরা তাঁদের পরিকল্পনা, অগ্রাধিকার ও রাজনৈতিক দর্শন তুলে ধরেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক এনসিপি নেতা তাসনিম জারা ফুটবল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিপরীতে অবস্থান নিয়েও তিনি আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলেন, তাঁর ইশতেহার কেবল প্রতিশ্রুতির তালিকা নয়, বরং জনগণের সঙ্গে একটি চুক্তি। এই চুক্তি বাস্তবায়নে তাঁর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ঢাকা–৯ আসনের জন্য ছয় দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে জারা উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, জননিরাপত্তা এবং সংসদ সদস্যদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন। স্বাস্থ্যসেবার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সময়মতো ও পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে প্রতিবছর বহু মানুষের মৃত্যু হয়। নির্বাচিত হলে তিনি তাঁর পেশাগত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ঢাকা–৯ এলাকায় মানসম্মত ও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবেন। কমিউনিটি ক্লিনিক সম্প্রসারণ এবং সেবার মান উন্নয়নের কথাও তিনি বলেন। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে স্কুলগুলোতে ভাষা ক্লাব, লাইব্রেরি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুবিধা চালুর অঙ্গীকার করেন তিনি। পাশাপাশি জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নারী ও শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন। মাদকের অপব্যবহার রোধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে জারা বলেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জবাবদিহিতার প্রশ্নে তিনি বলেন, অনেক এমপি নির্বাচনের পর শিথিল হয়ে পড়েন—এই সংস্কৃতির পরিবর্তন দরকার। এ লক্ষ্যে তিনি একটি স্থায়ী নির্বাচনী এলাকা কার্যালয় স্থাপনের ঘোষণা দেন, যা সন্ধ্যা পর্যন্ত খোলা থাকবে। নাগরিকদের কোনো অভিযোগ ফাইলচাপা পড়ে থাকবে না; কোনো মাধ্যম ছাড়াই তা সরাসরি একটি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডে উপস্থাপিত হবে।
তিনি আরও বলেন, “আমি কোনো পেশাদার রাজনীতিবিদ নই। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাজনীতির একটি নতুন ব্র্যান্ড প্রচারের লক্ষ্যেই রাজনীতিতে এসেছি।” লাউডস্পিকার ও শোডাউনের রাজনীতির বদলে ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আস্থার রাজনীতিতে তিনি গুরুত্ব দেন এবং ভোটারদের ফুটবল প্রতীকে ভোট দিয়ে নতুন ধারার রাজনীতি শুরুর আহ্বান জানান।
এদিকে যুগ্ম আহ্বায়ক, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও ১০ দলীয় জোট ‘ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ’ মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী জাবেদ রাসিনও ঢাকা–৯ আসনের আরেকজন আলোচিত প্রার্থী। তাঁর নির্বাচনী প্রতীক শাপলা কলি। নিজের ইশতেহারে তিনি ঢাকা–৯ কে একটি স্মার্ট সিটি ও জনবান্ধব নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। পুরো এলাকাকে সিসিটিভি, স্মার্ট স্ট্রিট লাইট ও ফ্রি ওয়াইফাই জোনের অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। ফুটপাত দখলমুক্ত করে পথচারী ও নারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা, পাশাপাশি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে বিশেষ ফায়ার সেফটি ব্যবস্থা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়ার কথাও তাঁর ইশতেহারে উঠে আসে।
প্রচারণা ও গণসংযোগে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন ধানের শীষের প্রার্থী হাবিবুর রশিদ হাবিব। একাধিক বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে নির্বাচনী লড়াইয়ে নিজের ইশতেহার পাঠ করে তিনি বলেন, “আমি ক্ষমতার রাজনীতি করি না; আমি মানুষের জীবনমান পরিবর্তনের রাজনীতি করি। সবার অধিকার আদায় এবং এই মাটির দায় শোধ করাই আমার রাজনীতি।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, জবাবদিহিতামূলক সুশাসন ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না। তাঁর লক্ষ্য ঢাকা–৯ কে রাজধানীর মানচিত্রে একটি মর্যাদাসম্পন্ন আসনে পরিণত করা।
হাবিবুর রশিদ হাবিব তিন দফা নির্বাচনী ইশতেহারে মানবিক ঢাকা–৯ এর রূপরেখা তুলে ধরেন। ইশতেহারে বলা হয়, মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও মানবিক সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠবে এই আসনে। ঢাকা–৯ হবে আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও যুববান্ধব একটি এলাকা, যেখানে তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগানো হবে। আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে তরুণদের অপার সম্ভাবনা ব্যবহারে তাঁর তৎপরতা অব্যাহত রাখার ঘোষণার পাশাপাশি তিনি নিরাপত্তা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সুশাসনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সামাজিক সহাবস্থান ও সম্প্রীতি নিশ্চিত করাই তাঁর রাজনীতির মূল অঙ্গীকার বলে জানান তিনি।
ইশতেহার পাঠের এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে ঢাকা–৯ আসনে নির্বাচনী প্রতিযোগিতার চিত্র আরও স্পষ্ট হলো—যেখানে প্রতিশ্রুতি, পরিকল্পনা এবং রাজনীতির ভিন্ন ভিন্ন দর্শন নিয়ে ভোটারদের সামনে হাজির হয়েছেন তিন প্রার্থী।