ঢাকায় এক পাইলট কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার দরিদ্র পরিবার চিহ্নিত করে সরাসরি নগদ সহায়তা দেওয়ার নতুন উদ্যোগ শুরু করেছে। সমাজকল্যাণ ও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, এই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব রাখা হবে না। উপকারভোগী নির্ধারণে ব্যবহার করা হবে ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ (PMT) স্কোরিং পদ্ধতি।
মন্ত্রী বলেন, ০ থেকে ১০০০ স্কোরের একটি সূচকে পরিবারগুলোকে মূল্যায়ন করা হবে। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় কোয়ান্টাইলে থাকা অতি দরিদ্র, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালিকাভুক্ত হবে। নির্দিষ্ট সময় পর পর দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা পর্যালোচনা করে দারিদ্র্যের এই ধাপ নতুন করে নির্ধারণ করা যাবে।
গ্রামীণ এলাকায় যেসব পরিবারের বসতভিটাসহ আবাদি জমি ০.৫০ একর বা তার কম এবং মাসিক আয় ও সম্পদ কম—তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। শহর এলাকায় আয় ও সম্পদের ভিত্তিতে যোগ্যতা নির্ধারণ হবে।
এই কর্মসূচির একটি বড় দিক হলো, কার্ডটি পরিবারের ‘মা’ বা নারী প্রধান সদস্যের নামে দেওয়া হবে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এতে নারীর ক্ষমতায়ন বাড়বে এবং অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে পরিবারকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত জোরদার হবে।
নির্বাচিত প্রতিটি পরিবার মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ অর্থ সহায়তা পাবে। এই অর্থ সরাসরি সরকারি কোষাগার থেকে ‘গভর্নমেন্ট টু পারসন’ (জি-টু-পি) পদ্ধতিতে সুবিধাভোগী নারীর মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক হিসাবে জমা হবে। এতে মধ্যস্বত্বভোগী বা অনিয়মের সুযোগ কমবে বলে দাবি করা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, দেশে বর্তমানে ৯৫টির বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু আছে। কিন্তু সমন্বয়ের অভাব, একই ব্যক্তির একাধিক সুবিধা নেওয়া এবং প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ পড়ার মতো সমস্যা রয়েছে। নতুন ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো—“ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক” এই ধারণার ভিত্তিতে একটি সমন্বিত ও বৈষম্যহীন কাঠামো গড়ে তোলা।
তিনি জানান, সংবিধানের ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদে নাগরিকের সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করার যে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার কথা বলা হয়েছে, এই কর্মসূচি তারই একটি বাস্তব প্রয়োগ।
পাইলট পর্যায়ে দেশের ১৪টি ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের এলাকা নির্বাচন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
- ঢাকার বনানী কড়াইল বস্তি
- মিরপুরের অলিমিয়ারটেক ও বাগানবাড়ী বস্তি
- চট্টগ্রামের পতেঙ্গা শিল্প এলাকা
- বান্দরবানের লামা (পার্বত্য অঞ্চল)
- সুনামগঞ্জের দিরাই (হাওড় এলাকা)
- ঠাকুরগাঁও সদর (সীমান্তবর্তী এলাকা)
এলাকা নির্বাচনে দারিদ্র্যের ঘনত্ব, ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ ও অনগ্রসরতা বিবেচনা করা হয়েছে।
প্রথম ধাপে ১৪টি ইউনিটে ১০ হাজার পরিবারকে কার্ড দেওয়া হবে। পরে প্রতি ধাপে ১০ হাজার করে বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে ৪০ হাজার পরিবারকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
মন্ত্রী এই উদ্যোগকে “দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তির একটি ঐতিহাসিক সনদ” হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করবে সঠিক বাছাই, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার ওপর—যা পাইলট পর্যায়ের ফলাফলেই স্পষ্ট হবে।