অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে নারী এশিয়া কাপের মঞ্চে প্রথমবারের মতো পা রাখল বাংলাদেশ। উদ্বোধনী ম্যাচেই প্রতিপক্ষ ছিল বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ও রেকর্ড ৯ বারের শিরোপাজয়ী চীন। শক্তি ও অভিজ্ঞতায় এগিয়ে থাকা দলের বিপক্ষে ২-০ গোলে হারলেও বাংলাদেশের মেয়েরা দেখিয়েছে সংগঠিত ও আত্মবিশ্বাসী ফুটবল।
মঙ্গলবার (৩রা মার্চ) সিডনির কমব্যাঙ্ক স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৭তম স্থানে থাকা চীনের বিপক্ষে লড়াই সহজ হবে না। র্যাঙ্কিংয়ে ১১২ নম্বরে থাকা বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো এই আসরে খেলতে নেমেছে। তবু শুরুতে চোখে চোখ রেখে লড়েছে পিটার বাটলারের দল।
বাংলাদেশ কোচ পিটার বাটলার ম্যাচে আক্রমণাত্মক মানসিকতারই পরিচয় দেন। চীনের মতো গতিময় দলের বিপক্ষে অনেক দল নিচে নেমে রক্ষণ সামলায়। কিন্তু বাংলাদেশ খেলেছে হাই লাইন ডিফেন্স নিয়ে। পুরো দলকে কমপ্যাক্ট রেখে মাঝমাঠ থেকে চাপ তৈরি এবং দ্রুত প্রেসিং—এই কৌশলেই আটকে দেওয়ার চেষ্টা ছিল প্রতিপক্ষকে।
প্রথমার্ধে একাধিকবার অফসাইড ট্র্যাপে পড়েছে চীন। একটি গোলও বাতিল হয় অফসাইডের কারণে। ডিফেন্ডারদের সমন্বয় ও টাইমিং ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে এমন কৌশলে ঝুঁকিও থাকে। প্রথমার্ধের শেষ দিকে সেই ঝুঁকির মূল্যই দিতে হয়েছে বাংলাদেশকে।
ম্যাচের ১৪তম মিনিটে প্রায় ৩৫ গজ দূর থেকে দুর্দান্ত শট নেন ঋতুপর্ণা চাকমা। বলটি ক্রসবারের ওপর দিয়ে কোনোমতে ঠেলে দেন চীনের গোলরক্ষক। ওই মুহূর্তে চমকে যায় চীন।
গোলবারের নিচে নিয়মিত কিপার রূপনা চাকমার বদলে সুযোগ পান তরুণ মিলি আক্তার। সাহসী সিদ্ধান্তে চমক দেন কোচ। মিলি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করেন।
প্রথমার্ধের ৪৪ মিনিট পর্যন্ত বাংলাদেশ চীনের আক্রমণ ঠেকিয়ে রাখে। কিন্তু বিরতির ঠিক আগে গোল করেন ওয়াং হুয়াং। যোগ করা সময়ে আরেকটি গোল হজম করে বাংলাদেশ। ফলে বিরতিতে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় চীন।
বিরতির পর তিনটি পরিবর্তন আনেন বাটলার। দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশ আরও গুছিয়ে খেলতে শুরু করে। বল দখলে প্রায় ৪২ শতাংশ সময় ধরে রাখে দলটি। আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণে কয়েকবার সুযোগও তৈরি হয়।
৫৮তম মিনিটে মিলির অসাধারণ সেভে ব্যবধান বাড়তে দেয়নি বাংলাদেশ। রক্ষণে শিউলী আজিম, কোহাতি কিস্কুদের লড়াই ছিল প্রশংসনীয়। শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয়ার্ধে আর কোনো গোল হজম করেনি দলটি।
চীন নারী ফুটবল এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দল। তারা রেকর্ড ৯ বার এশিয়া কাপ জিতেছে এবং ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে রানার্স-আপ হয়েছিল। অভিজ্ঞতা, ফিটনেস ও কৌশলে এগিয়ে থাকা দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের এই লড়াই ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বার্তা দেয়।
২০২২ ও ২০২৪ সালে টানা দুইবার সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাংলাদেশের এই তরুণ দলের গড় বয়স প্রায় ২০ বছর। বয়সভিত্তিক পর্যায় থেকে একসঙ্গে খেলে আসার অভিজ্ঞতা তাদের বড় শক্তি।
ম্যাচ শেষে বাংলাদেশের ডাগআউটে গিয়ে সম্মান জানান চীনা খেলোয়াড়রা। গ্যালারিতে উপস্থিত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সমর্থনও ছিল চোখে পড়ার মতো।
স্কোরলাইন ২-০। কিন্তু এই হার শুধু পরিসংখ্যান নয়। এটি ছিল বাংলাদেশের জন্য শেখার, সাহস দেখানোর এবং এশিয়ার বড় মঞ্চে নিজেদের পরিচয় জানানোর এক ঐতিহাসিক শুরু।