পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে আবারও জেগে উঠেছে তিস্তার পাড়

 

নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুরজুড়ে তিস্তা নদী শুধু একটি জলধারা নয়—এ নদী এখানকার মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন, জীবিকার উৎস এবং সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু গত কয়েক দশকে এই তিস্তা হয়ে উঠেছে বেদনার নাম। নদীর শুকিয়ে যাওয়া, হঠাৎ ভাঙন, খরা ও বন্যা—সব মিলিয়ে নদীপাড়ের মানুষ আজ টিকে থাকার লড়াইয়ে নামতে বাধ্য হয়েছে।

এই বাস্তবতার মধ্যেই তিস্তা তীর জুড়ে আবারও জেগে উঠেছে জনতার কণ্ঠস্বর। “তিস্তা সমস্যা সমাধানে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন চাই”—এই স্লোগানকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) তিস্তা ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় অনুষ্ঠিত হয় মশাল প্রজ্বলনের বিশাল কর্মসূচি।

কর্মসূচিতে অংশ নেন স্থানীয় কৃষক, দিনমজুর, শিক্ষার্থী ও নারী সমাজসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। বক্তারা বলেন, “আমরা তিস্তা পাড়ের মানুষ—দল-মত নির্বিশেষে তিস্তার ন্যায্য পানির হিস্যা চাই।”

গণশুনানি থেকে আন্দোলনের মশালে

এই আন্দোলনের সূত্রপাত কয়েক মাস আগে, ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি। সেদিন তিস্তা ব্রিজের পাশে ‘তিস্তা সমস্যা সমাধানে গণশুনানি’ অনুষ্ঠিত হয়। উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ান হাসান এবং আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়ার উপস্থিতিতে স্থানীয় মানুষ তাদের দুর্ভোগ ও দাবি তুলে ধরেন।

গণশুনানিতে তিস্তা পাড়ের একজন প্রতিনিধি বলেন, “তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া এই অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।”

গণশুনানির প্রতিক্রিয়ায় পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ান হাসান পরবর্তীতে প্রায় আড়াই শ কোটি টাকার বরাদ্দ দিয়ে দুই ধাপে তিস্তার দুই পাড়ে ৪০ কিলোমিটার ভাঙনরোধ প্রকল্প হাতে নেন। এই প্রকল্প এখন বাস্তবায়নাধীন। স্থানীয়রা এই উদ্যোগের জন্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেও মনে করেন, এটি কেবল প্রাথমিক পদক্ষেপ।

৪০ কিলোমিটার বাঁধে সমাধান নয়

স্থানীয় কৃষক ও সমাজকর্মীরা বলছেন, ৪০ কিলোমিটার বাঁধ রক্ষার কাজ কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে বটে, কিন্তু এতে তিস্তা সমস্যার মূল সমাধান আসেনি। নদীর প্রবাহ ক্রমে কমে যাচ্ছে, বর্ষায় হঠাৎ পানি বৃদ্ধি আবার ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার এক কৃষক বলেন,

“তিস্তায় এখন আর আগের মতো পানি নেই। ভারত একতরফা পানি আটকে রাখে। বর্ষায় হঠাৎ ছেড়ে দিলে ভেসে যায় ফসল ও ঘরবাড়ি।”

তাদের মূল দাবি—তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং ভারতের সঙ্গে যৌথ নদী ব্যবস্থাপনায় ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিত করা।

তিস্তা নদীর উৎপত্তি ভারতের সিকিমে। বাংলাদেশে প্রবেশের আগে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তিস্তা ব্যারেজ থেকে বিপুল পরিমাণ পানি সরিয়ে নেওয়া হয়। ফলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ অংশে তিস্তা প্রায় মরে যায়। নদীর তলদেশে ধানচাষ অসম্ভব হয়ে পড়ে, পানির অভাবে বন্ধ হয়ে যায় সেচ কার্যক্রম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে নদী ব্যবস্থাপনা উন্নত হবে, জলধারণ ক্ষমতা বাড়বে, এবং প্রায় ২১ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষিত থাকবে। কিন্তু প্রকল্পটি এখনো আন্তর্জাতিক আলোচনার জটিলতায় আটকে আছে।

দল-মত নির্বিশেষে এক দাবি

আয়োজকদের বক্তব্য, “তিস্তা নদীর প্রশ্ন দলীয় নয়, এটি বেঁচে থাকার প্রশ্ন। সরকার, বিরোধী দল—সবাইকে একই কণ্ঠে বলতে হবে: তিস্তার ন্যায্য হিস্যা চাই।”

তিস্তা পাড়ের এক শিক্ষক বলেন,

“আমরা চাই, সরকার জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিক। তিস্তা নদীকে বাঁচানো মানে উত্তরবঙ্গকে বাঁচানো।”

সরকার কি শুনবে তিস্তা পাড়ের কণ্ঠস্বর?

তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে, তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব অগ্রগতি ধীরগতি। চীন ও ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক জটিলতা, পরিবেশগত প্রভাব, এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা—সব মিলিয়ে প্রকল্পটি এখনো পূর্ণ বাস্তবায়নের অপেক্ষায়।

জনগণের আশা, সরকারের দৃষ্টি এবার সত্যিই তিস্তার দিকে ফিরবে। মশালের আলোয় তারা যে সংকল্প প্রকাশ করেছে—তা যেন কাগজে আটকে না থাকে।

তিস্তা এখন শুধু এক নদীর নাম নয়; এটি উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবনরেখা, আন্দোলনের প্রতীক এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধের এক পরীক্ষাক্ষেত্র। জনগণ এখন প্রশ্ন তুলছে—“তিস্তা বিষয়ক যেকোনো আয়োজনে জনগণের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণও কি সরকারের দৃষ্টিতে পড়বে না?”

তিস্তার এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে—এবার সরকারকেই।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *