চীনের অর্থনীতি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম। একসময় ‘বিশ্বের কারখানা’ হিসেবে পরিচিত এই দেশ এখন সেবাখাত, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। এবার দেশটি ঘোষণা দিয়েছে—আগামী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২৬–২০৩০) মেয়াদে তারা আরও উন্মুক্ত অর্থনীতি গড়ে তুলবে।
এ ঘোষণাটি এসেছে চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াং ওয়েনথাও-এর মুখে, যিনি শুক্রবার (২৪ অক্টোবর) এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “চীন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে চায়।”
নতুন পরিকল্পনায় কী আছে
ওয়াংয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, চীনের নতুন পরিকল্পনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে সেবাখাত ও বাজার প্রবেশাধিকার। এখন পর্যন্ত চীনের উৎপাদন ও রপ্তানি খাতই ছিল প্রবৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি। কিন্তু নতুন পরিকল্পনায় দেশটি বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সেবাখাত আরও উন্মুক্ত করতে যাচ্ছে।
অর্থাৎ, ব্যাংকিং, বীমা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তিভিত্তিক সেবা—এই খাতগুলোতে বিদেশি কোম্পানির উপস্থিতি বাড়ানো হবে।
চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) ২০তম কেন্দ্রীয় কমিটির চতুর্থ পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে সম্প্রতি গৃহীত হয়েছে ‘১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের সুপারিশ’। সেখান থেকেই এই দিকনির্দেশনা এসেছে। লক্ষ্য—২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময়কে এমন এক রূপান্তরমুখী পর্যায়ে পরিণত করা, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সম্পৃক্ততা একসঙ্গে এগিয়ে যাবে।
চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী বিনিয়োগের নিয়ম সহজ করা হবে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সংক্ষিপ্ত করা হবে, এবং বাণিজ্যিক স্বচ্ছতা বাড়ানো হবে।
বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যাতে দেশীয় উদ্যোক্তাদের মতোই সমান সুযোগ পান, সেই পরিবেশ তৈরিতে সরকার কাজ করছে।
চীনের অর্থনীতিতে এখন সেবাখাতের অবদান ৫৪ শতাংশের বেশি। গত এক দশকে এই খাতে প্রবৃদ্ধি দ্বিগুণ হয়েছে। বিশেষ করে ডিজিটাল সেবা, আর্থিক প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন চীনকে নতুন পথে নিয়ে যাচ্ছে।
ওয়াং ওয়েনথাও বলেন, “চীন বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার অংশ হতে চায়। আমাদের উন্মুক্ততার মাত্রা যত বাড়বে, বৈশ্বিক অংশীদারিত্বও তত শক্তিশালী হবে।”
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
এই ঘোষণা এসেছে এমন সময়ে, যখন চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে বাণিজ্যিক টানাপোড়েন নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ সম্প্রতি চীনা প্রযুক্তি পণ্য, বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে।
তবু চীন এক ধরনের ‘প্রতিকৌশল’ নিচ্ছে—নিজেদের বাজার আরও উন্মুক্ত করে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ছে।
‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)’-এর মাধ্যমে ইতোমধ্যে ১৫০টির বেশি দেশের সঙ্গে অবকাঠামো ও বিনিয়োগচুক্তি করেছে বেইজিং। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন পরিকল্পনা সেই উদ্যোগের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও মজবুত করবে।
দুই দশক আগের চীনের তুলনায় এখনকার চীন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। কোভিড-পরবর্তী সময়ের ধাক্কা কাটিয়ে দেশটি এখন প্রবৃদ্ধি ও উদ্ভাবনের নতুন ভারসাম্য খুঁজছে।
বিশ্বজুড়ে যখন অর্থনৈতিক মন্দার খবর, তখন চীন ঘোষণা দিচ্ছে উন্মুক্ততার। এতে বোঝা যাচ্ছে, দেশটি শুধু নিজের অর্থনীতি নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোয় নেতৃত্বের অবস্থান নিতে চাইছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, চীনের এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য ইতিবাচক বার্তা। কারণ, নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হলে শুধু চীন নয়, তাদের বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোও লাভবান হবে।
বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা
বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই চীনের অন্যতম বাণিজ্য অংশীদার। তৈরি পোশাক, কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো খাতে দুই দেশের সহযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে।
চীন যদি আগামী বছরগুলোতে সেবাখাত বিদেশি অংশীদারদের জন্য খুলে দেয়, তবে বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য প্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় নতুন দরজা খুলে যেতে পারে।
চীনের অর্থনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে—একদিকে অভ্যন্তরীণ রূপান্তর, অন্যদিকে বৈশ্বিক সম্পৃক্ততা। ওয়াং ওয়েনথাওর ঘোষণা তাই কেবল পরিকল্পনা নয়, এক ধরনের অর্থনৈতিক বার্তা—চীন আর পেছনে তাকাতে চায় না, বরং বিশ্ব অর্থনীতির নেতৃত্বে নিজের অবস্থান আরও স্পষ্ট করতে চায়।
সূত্র : সিনহুয়া