
রঙিন বেদি, গাঁদা ফুল, মোমবাতি আর চিনির খুলি—এই সাজে সেজেছে মেক্সিকোর ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট। কারণ, দেশজুড়ে শুরু হয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব ‘দিয়া দে লস মুয়ের্তোস’ বা ‘মৃতদের দিবস’। প্রতি বছর নভেম্বরের প্রথম দুই দিন এই উৎসব পালিত হয় প্রয়াত আত্মীয়দের স্মরণে, তবে তা শোকের নয়—আনন্দের উৎসব হিসেবে।
বিশ্বাস করা হয়, এই সময়ে জীবিত ও মৃতেরা একে অপরের সঙ্গে দেখা করতে পারে। এজন্য পরিবারগুলো ঘরে ও কবরস্থানে তৈরি করে রঙিন বেদি, যাকে বলা হয় ‘অফরেন্দা’। এসব বেদিতে রাখা হয় মৃতজনের ছবি, প্রিয় খাবার, গাঁদা ফুল, মোমবাতি ও মজার ছলে লেখা কবিতা ‘কালাভেরা’। গাঁদা ফুলের ঘ্রাণ ও উজ্জ্বল রঙ নাকি আত্মাদের পথ দেখিয়ে ঘরে ফিরিয়ে আনে।
বেদিতে সাজানো হয় জীবনের চার উপাদান—পানি, আগুন, মাটি ও বায়ু। পানিতে প্রতীকীভাবে তৃষ্ণা মেটানো হয়, আগুনে পথ দেখানো হয়, মাটিতে রাখা হয় খাবার ও উপহার, আর বায়ুর প্রতীক থাকে রঙিন কাগজের নকশায়।
উৎসবের আরেকটি পরিচিত প্রতীক হলো চিনির খুলি বা কালাভেরা দে আজুকার, যা জীবনের চক্রের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ খাবারের মধ্যে আছে ‘পান দে মুয়ের্তো’, অর্থাৎ মৃতদের রুটি—চিনি ও হাড়ের মতো নকশায় সাজানো এই রুটি মৃত প্রিয়জনদের স্মরণে খাওয়া হয় এবং বেদিতেও রাখা হয় উপহার হিসেবে।

উৎসবজুড়ে দেখা যায় এক বিশেষ চরিত্র—‘লা কাত্রিনা’, ফরাসি ধাঁচের টুপি পরা এক কঙ্কাল নারী। এই চরিত্রের মাধ্যমে কার্টুনিস্ট হোসে গুয়াদালুপে পোসাদা দেখাতে চেয়েছিলেন, মৃত্যুর কাছে সবাই সমান। পরে শিল্পী দিয়েগো রিভেরা তাকে নাম দেন ‘লা কাত্রিনা’, যার অর্থ ‘ধনী নারী’।
‘দিয়া দে লস মুয়ের্তোস’-এর শিকড় প্রাচীন অ্যাজটেক সংস্কৃতিতে, যেখানে মৃত্যু ছিল জীবনের নতুন সূচনা। স্পেনীয় উপনিবেশকারীরা ১৬ শতকে এই স্থানীয় বিশ্বাসকে ক্যাথলিকদের ‘অল সেন্টস ডে’ (১ নভেম্বর) ও ‘অল সোলস ডে’ (২ নভেম্বর)-এর সঙ্গে মিলিয়ে দেয়। সেখান থেকেই আজকের উৎসবের রূপ।
১ নভেম্বর উদযাপন করা হয় শিশুদের স্মরণে, যাদের বলা হয় ‘আনহেলিতোস’ (ছোট্ট ফেরেশতা), আর ২ নভেম্বর প্রাপ্তবয়স্ক মৃতদের জন্য।
আজ ‘দিয়া দে লস মুয়ের্তোস’ শুধু মেক্সিকোতেই নয়—যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, ফিলিপাইন ও লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশেও পালিত হয়। অনেকে এখন এমনকি অনলাইনে MiAltar ওয়েবসাইটে ভার্চুয়াল বেদি সাজিয়ে অংশ নিচ্ছেন এই ঐতিহ্যে।
রঙ, সংগীত, খাবার আর স্মৃতির মিশেলে ‘দিয়া দে লস মুয়ের্তোস’ আজ এক অনন্য উদযাপন—যেখানে মৃত্যু নয়, জীবনের আনন্দই মুখ্য।
আল জাজিরা অবলম্বনে