বিদেশ সফরের নামে মানব পাচার রুখতে কঠোর হচ্ছে এনএসসি

বাংলাদেশের ক্রীড়া জগতে বিদেশে খেলোয়াড় পাঠানোর নামে মানব পাচার ও অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনেক সময় দেখা গেছে, অখ্যাত বা অযোগ্য খেলোয়াড়রা ‘আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ’ বা ‘ট্রেনিং প্রোগ্রাম’-এর নামে বিদেশে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। এই প্রবণতা শুধু দেশের ভাবমূর্তিকেই ক্ষুণ্ণ করছে না, বরং যোগ্য খেলোয়াড়দের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করছে।

এই প্রেক্ষাপটে, মানব পাচার প্রতিরোধ ও যোগ্য খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে সুযোগ নিশ্চিত করতে নতুন নিয়ম চালু করেছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। ২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর জারি করা এক চিঠিতে এনএসসি দেশের সব ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশনকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে—এখন থেকে কোনো ক্রীড়া দলকে বিদেশে পাঠানোর আগে ফ্লাইটের অন্তত ১০ দিন আগে জিও (Government Order বা সরকারি আদেশ) পাওয়ার জন্য প্রস্তাব পাঠাতে হবে।

কেন নতুন নিয়ম?

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর নামে একাধিক অনিয়মের ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। ফুটবল, হকি, কাবাডি, এমনকি অ্যাথলেটিকসেও বিভিন্ন সময়ে “বিদেশ সফর” বা “প্রশিক্ষণ” প্রকল্পের আড়ালে খেলোয়াড়দের পাচার বা অননুমোদিতভাবে বিদেশে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে—কিছু মধ্যস্বত্বভোগী কর্মকর্তা ও দালালচক্র এসব সফরের সুযোগে লাভবান হয়েছেন, অথচ প্রকৃত খেলোয়াড়রা উপেক্ষিত থেকেছেন।

এই বাস্তবতায় এনএসসি নতুন নিয়মে জিও প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও বাধ্যতামূলক করেছে। এখন থেকে কোনো খেলোয়াড় বিদেশ সফরে গেলে তার ফিটনেস রিপোর্ট, পারফরম্যান্স–সংশ্লিষ্ট নথি ও নির্বাচনের প্রমাণপত্র এনএসসির কাছে জমা দিতে হবে।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী,

  • খেলোয়াড় নির্বাচনের সময় ফেডারেশনগুলোকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে কে কোন ইভেন্টে অংশ নিচ্ছে,
  • কাদের অর্থে সফর হচ্ছে (সরকারি নাকি বেসরকারি),
  • সফরের মেয়াদ ও উদ্দেশ্য কী,
  • সফর শেষে খেলোয়াড়রা দেশে ফিরেছে কিনা—তা প্রতিবেদন আকারে এনএসসিকে জানাতে হবে।

এনএসসি জানিয়েছে, এসব তথ্য সময়মতো না দিলে ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট ফেডারেশনের বিদেশ সফরের অনুমোদন স্থগিত করা হতে পারে।

মানব পাচারের পেছনের চক্র

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অতীতে কিছু ক্রীড়া সংগঠন “ইউরোপ টুর্নামেন্ট”, “গালফ প্রশিক্ষণ ক্যাম্প”, বা “প্রবাসী প্রতিযোগিতা”-র অজুহাতে এমন ব্যক্তিদের পাঠিয়েছে, যাদের সঙ্গে পেশাদার খেলাধুলার কোনো সম্পর্ক ছিল না।
এই ব্যক্তিরা বিদেশে পৌঁছে আর ফিরে আসেননি—যা মূলত “মানব পাচার” হিসেবে বিবেচিত হয়।

২০১৯ সালে একটি জেলা ফুটবল ফেডারেশনের নামে ১২ জনকে ইতালি পাঠানোর অভিযোগ তদন্তে উঠে আসে যে, তাদের কেউই আসলে নিবন্ধিত খেলোয়াড় ছিলেন না।
একইভাবে ২০২৩ সালে কয়েকজন কাবাডি খেলোয়াড় ‘মালয়েশিয়া টুর্নামেন্ট’-এর নাম করে বিদেশে গিয়ে নিখোঁজ হন।

খেলোয়াড়দের পক্ষে এনএসসি

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন নিয়মের মূল উদ্দেশ্য কোনো সফর বন্ধ করা নয়, বরং নিয়মিত ও যোগ্যতার ভিত্তিতে খেলোয়াড় বাছাই নিশ্চিত করা
এনএসসি পরিচালক (প্রশাসন) জানিয়েছেন,

“আমরা চাই বিদেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব যেন প্রকৃত খেলোয়াড়রাই করেন। এজন্য জিও প্রক্রিয়াকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে অনিয়ম কমবে এবং প্রকৃত প্রতিভা সুযোগ পাবে।”

ফেডারেশনগুলোর প্রতিক্রিয়া

কিছু ফেডারেশন এনএসসির পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে, আবার কেউ কেউ বলছে, নতুন নিয়মে প্রশাসনিক জটিলতা বাড়বে।
বাংলাদেশ ভলিবল ফেডারেশনের এক কর্মকর্তা বলেন,

“আমরা মানব পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর। তবে জিওর সময়সীমা যদি খুব দীর্ঘ হয়, তাহলে বিদেশি আয়োজকদের আমন্ত্রণের সময়মতো সাড়া দেওয়া কঠিন হবে।”

অন্যদিকে বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের এক কোচের ভাষায়,

“যদি সব দল নিয়ম মেনে চলে, তাহলে আন্তর্জাতিক সফরের নাম করে ফাঁকিবাজির সুযোগ থাকবে না—এটাই সবচেয়ে বড় লাভ।”

বিশেষজ্ঞদের মতামত

ক্রীড়া বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি সঠিক সময়ে নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তাদের মতে, বাংলাদেশে ক্রীড়া প্রশাসনে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় যোগ্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে এনএসসির নজরদারি অপরিহার্য
তবে তারা জোর দিচ্ছেন, শুধু নিয়ম জারি করলেই হবে না—তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে কঠোরভাবে।

বিদেশে খেলোয়াড় পাঠানোর নামে মানব পাচার শুধু আইনি নয়, নৈতিক অপরাধও। এটি দেশের ক্রীড়া অঙ্গনকে কলঙ্কিত করে।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নতুন উদ্যোগে যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা পায়, তবে এটি হতে পারে বাংলাদেশের ক্রীড়া প্রশাসনের এক গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *