
বিজয় মজুমদার
আমি কক্সবাজার গিয়েছি। পতেঙ্গা গিয়েছি। গিয়েছি টেকনাফেও। কিন্তু আমার সবচেয়ে প্রিয় সৈকতের নাম—শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ, ওরফে সৈকত।
এই ‘সৈকত’ নামটা আমি প্রথম শুনেছিলাম এক হতাশার দিনে—১৯৯৪ সালের আইসিসি ট্রফিতে। সেবার কেনিয়ার কাছে হেরে আমরা নিশ্চিত হই, ১৯৯৬ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেলা হচ্ছে না। ম্যাচটি সরাসরি সম্প্রচার করেছিল বাংলাদেশ বেতার।
সেই ম্যাচে বাংলাদেশের বোলাররা যখন একের পর এক রান দিচ্ছে, তখন প্রথম সাত ওভারে দারুণ বল করছিলেন শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ সৈকত। তখনই তাঁর প্রতি মুগ্ধ হই। ভাবিনি, একদিন তাঁর সঙ্গে একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করব।
২০০৪ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সিদ্ধান্তে কর্পোরেট লিগ শুরু হয়। মোবাইল সেবা প্রদানকারী কোম্পানি একটেলও তাতে অংশ নেয়, এবং আমি তখন একটেলের কর্মচারী। দলের অধিনায়ক ছিলেন মোহাম্মদ রফিক, কোচ ওয়াহেদুল গণি। দলের অন্যতম সেরা বোলার হিসেবে আবির্ভূত হন সৈকত।
তখন একটেলের মার্কেটিং প্রধান ছিলেন মালয়েশিয়ান নাগরিক হোসে রবি—জাতিতে তামিল, হৃদয়ে ক্রিকেটপ্রেমী। একদিন কল সেন্টারে এসে তিনি বললেন,
“আমাদের দল খেলছে, কিন্তু গ্যালারি ফাঁকা কেন? এত কাস্টমার, এত কর্মচারী—তারা কোথায়?”
মাঠে গিয়ে তিনি আবার মজা করে জিজ্ঞেস করলেন, “আমাদের কোচ আর ক্যাপ্টেনের কৌশলটা কী—একবার জয়, একবার হার, আবার জয়, আবার হার!”
এরপর অফিসে নির্দেশ এলো—যাদের বিকেলে ডিউটি, তারা মাঠে যাবে, খেলা দেখবে, বাদাম খাবে! নির্দেশটি দিয়েছিলেন কাস্টমার কেয়ার ম্যানেজার বন্যা আপা।
বসের আদেশ, তাই আমি-ফরিদসহ কয়েকজন মিলে গেলাম আবাহনীর মাঠে। ফরিদ আমার সহকর্মী, তবে সে বিকেএসপির ছাত্র এবং ক্রিকেটার। আশা করেছিলাম, তাকে দলে নেওয়া হবে। হয়নি। তাই সে মন খারাপ করে বসেছিল, আমিও পাশে গিয়ে বসলাম।
হঠাৎ দেখি, আমার প্রিয় সেই সৈকত এসে ফরিদের পাশে বসলেন। ফরিদ পরিচয় করিয়ে দিল, “এনি আমাদের দলের সৈকত ভাই।” আমি যেন হিরোকে সামনে দেখে অবাক হয়ে গেলাম।
কিছুদিনের মধ্যেই কল সেন্টারে নতুন ব্যাচে সৈকতকে দেখি। একটেল কর্পোরেট লিগ না জিতলেও সৈকত জয় করে নিয়েছিল সবার মন। মাঠ থেকে তাঁকে সরাসরি নিয়ে আসা হয় কল সেন্টারে।
সহকর্মী হিসেবে সৈকতের সঙ্গে অনেক রাত কাটিয়েছি ঢাকার রাস্তায়—রাতের শিফট শেষে কোম্পানির গাড়িতে একসঙ্গে ফিরতাম। সৈকত ছিলেন কাজপাগল, কিন্তু আন্তরিক। গ্রাহকদের সঙ্গে আচরণে ছিল স্বচ্ছতা ও যত্ন।
সে প্রতিটি তথ্য জানার চেষ্টা করত। নতুন ট্যারিফ, পরিবর্তিত রেট, বা প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির কোনো আপডেট—সব জানত সে। প্রতিদিন অফিসে এসে প্রথমেই জিজ্ঞেস করত, “আজ নতুন কিছু এসেছে?”
সৈকত শুধু কাজে নয়, কথায়ও ছিল সৎ।
১৯৯৪ সালের সেই পরাজয়ের পর ধারাভাষ্যকারদের কথা শুনে আমি ভেবেছিলাম, উইকেটকিপার জাহাঙ্গীর আলমের ভুলেই বাংলাদেশ হেরেছিল। কিন্তু সৈকত বলল,
“না ভাই, ওটা ঠিক না। আমরা হেরেছি আমাদের ব্যাটিং-বোলিংয়ের ব্যর্থতায়।”
ক্রিকেটে আমি বিশেষজ্ঞ নই, কিন্তু সৈকতের বিনয় ও যুক্তিতে মুগ্ধ হয়েছিলাম। সে জানত—কাউকে ছোট করলে মানুষ বড় হয় না। কিন্তু সত্যের জায়গায় সে কখনো আপস করত না।
আজ সে বিশ্বসেরা একজন আম্পায়ার—আইসিসির এলিট প্যানেলের একমাত্র বাংলাদেশি প্রতিনিধি।
আমরা দুজনই একটেল ছেড়ে অন্য পথে গেছি, কিন্তু এখনো ক্রিকেট মাঠে তাঁর ছবি দেখলেই গর্বে বুক ভরে যায়।
খেলা দেখতে বসলে আশেপাশের সবাইকে বলি—
“ওই যে দেখো, আমার প্রিয় সৈকত।”