
আগুনের ভেতর দিয়ে হাঁটছে এক ফায়ারফাইটার। চারপাশে আগুনের শিখা, ধোঁয়া, জ্বলন্ত কাঠামো—তবু তার শরীরে পোড়ার চিহ্ন নেই। কারণ, সে যে পোশাক পরেছে, তা আগুনে গলে না, ছিঁড়ে না, নষ্ট হয় না।
এ দৃশ্য এখন কেবল সিনেমার নয়, বরং বাস্তবের এক গবেষণাগারে সম্ভব হয়েছে। চীনের গবেষকেরা এমন এক বিশেষ ফ্যাব্রিক তৈরি করেছেন, যা চরম তাপমাত্রাতেও অক্ষত থাকে। এই নতুন বস্ত্র প্রযুক্তি এখন অগ্নিনির্বাপণ, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি সুরক্ষা, এমনকি শিল্পকারখানার নিরাপত্তায় নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
আগুনের ভেতরেও টিকে থাকা ফ্যাব্রিক
চীনা প্রতিষ্ঠান Safmax সম্প্রতি উন্মোচন করেছে এমন এক অগ্নি-প্রতিরোধী ফ্যাব্রিক, যা প্রায় ১,২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (২,১৯২°F) তাপমাত্রায়ও গলে না বা বিকৃত হয় না। কোম্পানির প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা জিয়াং হুয়াংসেন জানিয়েছেন, “এই উপাদান এতটাই পাতলা যে মানুষের একক চুলের মোটা অংশের মাত্র এক শতাংশ, কিন্তু তার শক্তি অসাধারণ।”
এই ফ্যাব্রিক তৈরি হয়েছে একধরনের ন্যানো-মেমব্রেইন প্রযুক্তি দিয়ে। মজার বিষয় হলো, এটি একদিকে পানি আটকায়, কিন্তু বাতাসকে যেতে দেয়। অর্থাৎ, এটি ওয়াটারপ্রুফ ও ব্রিদেবল—একসঙ্গে দুটো গুণই বহন করছে।
ফায়ারফাইটারদের জন্য জীবনরক্ষাকারী প্রযুক্তি
প্রচলিত ফায়ারফাইটার পোশাক সাধারণত কেভলার বা নোমেক্স ফাইবারে তৈরি হয়। এসব উপাদান উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করলেও দীর্ঘ সময় আগুনে থাকলে নরম হয়ে যায় বা গলে যেতে পারে।
নতুন ফ্যাব্রিক সেই সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে গেছে। আগুনে ঘেরা স্থানে কাজ করা ফায়ারফাইটারদের জন্য এটি এক নিরাপদ ঢাল। গবেষক দলের মতে, এই উপাদান ব্যবহার করলে ফায়ারফাইটাররা আগুনের উৎসের আরও কাছাকাছি যেতে পারবেন, এবং সময়মতো মানুষ উদ্ধার করতে পারবেন—ঝুঁকি কমে আসবে অনেকটাই।
এছাড়া, এর বায়ু চলাচলযোগ্য বৈশিষ্ট্য শরীরের ঘাম বা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখবে, যা দীর্ঘ সময়ের মিশনে আরাম দেবে।
আরও বহুমুখী ব্যবহার
বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি বিস্ফোরণ বা আগুন ধরা এখনো বড় একটি ঝুঁকি। লিথিয়াম-আয়ন সেল অতিরিক্ত তাপে ফুলে উঠে জ্বলে যায়।
চীনা গবেষকেরা বলছেন, এই ফ্যাব্রিক ব্যাটারি প্যাকের বাইরের সুরক্ষা স্তর হিসেবে কাজ করতে পারে। আগুন লাগলেও এটি আগুনের বিস্তার রোধ করবে এবং আশপাশের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখবে। ফলে গাড়ি ও যাত্রী উভয়ের নিরাপত্তা বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি সুরক্ষায় এমন উপাদান ব্যবহার করা গেলে বিশ্বজুড়ে ব্যাটারি বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
এই নতুন উপাদান কেবল পোশাকে নয়—ব্যবহার হতে পারে নানা জায়গায়। ফায়ার ব্ল্যাঙ্কেট, অগ্নি প্রতিরোধক পর্দা, শিল্পকারখানার তাপ নিরোধক আবরণ, এমনকি গৃহস্থালি সুরক্ষা সামগ্রীতেও এটি ব্যবহার করা যাবে।
এর হালকা ও নমনীয় গঠন একে সহজে ভাঁজ করে রাখা বা বহনযোগ্য করে তোলে। গবেষক দলের সদস্যরা বলছেন, “এই ফ্যাব্রিক শুধু একটি আবিষ্কার নয়, এটি নিরাপত্তা শিল্পের ধারণাই বদলে দিতে পারে।”
ফ্যাব্রিকটি তৈরি হয়েছে এমন উপাদান দিয়ে যা পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও কম রাসায়নিক নির্ভর। অর্থাৎ এটি শুধু মানুষ নয়, পরিবেশের জন্যও নিরাপদ। প্রচলিত তাপ-প্রতিরোধী উপকরণ তৈরিতে যে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহৃত হয়, নতুন এই প্রযুক্তি তাতে একটি ‘সবুজ বিকল্প’ তৈরি করেছে।
ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি
চীনের বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ফ্যাব্রিকের প্রয়োগ কেবল পৃথিবীতেই নয়, ভবিষ্যতে মহাকাশ গবেষণাতেও হতে পারে। মহাকাশযান, রকেট বা উপগ্রহে উচ্চ তাপমাত্রা প্রতিরোধে এটি ব্যবহারযোগ্য হতে পারে।
ইতিমধ্যে বিভিন্ন শিল্প ও প্রতিরক্ষা সংস্থা ফ্যাব্রিকটি নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। চীনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক বলেন, “আগুনের ভয় যেখানে, সেখানে এই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত।”
আগুন মানুষের প্রাচীনতম বন্ধু, আবার ভয়ঙ্কর শত্রুও। সেই আগুনকে বশে আনার গল্প যত পুরোনো, তার প্রতিরোধের প্রযুক্তি ততই আধুনিক হচ্ছে।
চীনের এই নতুন ফ্যাব্রিক হয়তো আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে—আগুনকে থামানো না গেলেও, তার সামনে নিরাপদভাবে দাঁড়ানো এখন আর অসম্ভব নয়।