রাতের আকাশে তুরস্কের পতাকা উড়ছে, নিচে শহরের আলো ছড়িয়ে পড়েছে বসফরাসের জলে। ইস্তাম্বুলের এক পুরোনো আদালত ভবনে নথিপত্রের স্তূপের মাঝে বসে এক সরকারি কৌঁসুলি কলম ছুঁয়ে দিচ্ছেন এক কাগজে—সেখানে লেখা, Benjamin Netanyahu – War Crimes, Genocide, Crimes Against Humanity.
একটি স্বাক্ষর পড়তেই ইতিহাসের এক পাতা নড়ে উঠল।
তুরস্কের প্রসিকিউটররা শুধু কাগজে লিখে থেমে থাকেননি। তাঁরা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এবং সেনাপ্রধান ইয়াল জামিরের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করেছেন। এমনকি ঘোষণা দিয়েছেন—এই তিনজনের কেউ তুরস্কের আকাশসীমায় প্রবেশ করতে পারবে না।
একটা রাষ্ট্র যখন বলে “আমরা তাদের বিমানকেও ঢুকতে দেব না,” তখন বোঝা যায়, কথার চেয়ে কঠিন কিছু সেখানে কাজ করছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজার আকাশে যুদ্ধের আগুন জ্বলছে। শিশুর কান্না, হাসপাতালের ধ্বংসস্তূপ, আর বালির নিচে চাপা পড়া দেহ—এই চিত্রগুলো এখন গ্লোবাল বিবেকের সামনে।
কিন্তু প্রশ্নটা রাজনৈতিক নয়, মানবিক—এত মৃত্যু, এত ধ্বংসের দায় কে নেবে?
নেতানিয়াহু বলছেন—“এটা প্রতিরক্ষা।”
কিন্তু গাজার মানুষ বলছে—“এটা ধ্বংস।”
এই দুই শব্দের মাঝে, পৃথিবী দাঁড়িয়ে আছে বিচার আর অন্যায়ের সীমান্তে।
তুরস্কের সিদ্ধান্ত, এবং অন্য সাত দেশের নীরব প্রস্তুতি
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—তুরস্ক ছাড়াও আরও সাত দেশ—স্লোভেনিয়া, লিথুয়ানিয়া, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, ইতালি এবং কানাডা—নেতানিয়াহুকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার করার জন্য প্রস্তুত।
যদিও কেউ প্রকাশ্যে উচ্চারণ করেনি “আমরা গ্রেপ্তার করব,” তবুও তাদের আইনি কাঠামো এবং আইসিসি সদস্যপদ বলছে—যদি নেতানিয়াহু ওই দেশগুলোর মাটিতে পা রাখেন, আইন চুপ করে থাকবে না।
তুরস্কের আইন অনুযায়ী, যুদ্ধাপরাধ বা গণহত্যার মামলায় তাদের আদালত ‘ইউনিভার্সাল জুরিসডিকশন’ প্রয়োগ করতে পারে। অর্থাৎ অপরাধ যদি দেশের বাইরে ঘটে, তবুও বিচার তুরস্কের ভেতর হতে পারে।
এটাই সেই পথ, যেটি একদিন হিটলারের অনুসারীদের ধরেছিল, এবং একদিন হয়তো গাজার বালির নিচে হারানো নামগুলোর ন্যায় চাইবে।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) আগেই পরোয়ানা জারি করেছে।
কিন্তু সমস্যা হলো—ইসরায়েল আইসিসি সদস্য নয়।
তাই গ্রেপ্তার হবে কেবল তখনই, যদি তিনি এমন দেশে যান, যেটি আইসিসি সদস্য এবং গ্রেপ্তারের বাধ্যবাধকতা মানে।
কিন্তু বাস্তব পৃথিবীতে অনেক রাজনীতি কাজ করে। অনেক দেশ ন্যায়ের কথা বলে, কিন্তু সম্পর্কের কারণে নীরব থাকে।
নেতানিয়াহু জানেন সেটি। তাই হয়তো তিনি এখনও হাসেন, ক্যামেরার সামনে হাত নেড়ে বলেন, “আমরা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়ছি।”
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—গাজায় ৪০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে “যুদ্ধাপরাধ” বলছে, কিন্তু ইসরায়েল বলছে—“এটা আত্মরক্ষা।”
এই দুই শব্দের লড়াই এখন আদালতের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
তুরস্কের কৌঁসুলিরা বলছেন—“এটা নৈতিক দায়িত্ব।”
ইউরোপের কিছু দেশ বলছে—“আমরা পর্যবেক্ষণ করছি।”
কানাডা বলছে—“আমরা আইন মানব।”
যেন পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্র নিজের আয়নায় তাকিয়ে ভাবছে—ন্যায়ের পক্ষে থাকা মানে কী?
ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া
ইসরায়েলি সরকার তুরস্কের এই পদক্ষেপকে “রাজনৈতিক নাটক” বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তারা বলেছে—তুরস্কের আদালতের এখতিয়ার ইসরায়েলের ওপর প্রযোজ্য নয়।
তবুও নেতানিয়াহুর দফতরে একটা অস্বস্তি কাজ করছে। কারণ আইন যখন নড়তে শুরু করে, তখন তার ধীর গতি থেকেও ভয় আসে।
হেগের আদালত হয়তো দূরে, কিন্তু ইস্তাম্বুলের একটি পরোয়ানা অনেক সময় বিশ্ব রাজনীতির দরজা খুলে দিতে পারে।