বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। কিন্তু এখন সেই নদীই মানুষের শত্রু হয়ে উঠছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, সুনামগঞ্জ, ফরিদপুর ও চাঁদপুরে নদীভাঙন এক ভয়াবহ বাস্তবতা। প্রতি বছর বর্ষায় বা উজান থেকে পানি বাড়লেই নদী গিলে খায় ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, গাছপালা— এমনকি পুরো গ্রাম।
নদীভাঙন কীভাবে হয়
বাংলাদেশের নদীগুলো খুবই জীবন্ত। এগুলো প্রতিনিয়ত দিক বদলায়, কোথাও নতুন চর গড়ে তোলে, আবার কোথাও পুরোনো ভূমি ধ্বংস করে ফেলে। হিমালয়ের বরফ গলে পানির চাপ বাড়ে, বৃষ্টি হয় বেশি, আবার কখনও নদীর পাড় দুর্বল হয়ে যায়— এই সব মিলেই ভাঙন তৈরি হয়।
চরের মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপদে থাকে। তারা এক বছর ঘর তোলে, পরের বছর সেই ঘর নদীতে হারিয়ে যায়। অনেক পরিবার বছরে দুই-তিনবার পর্যন্ত ঘর বদল করতে বাধ্য হয়।
নদীভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় গরিব মানুষের। তারা জমি হারায়, ঘর হারায়, জীবিকা হারায়। নতুন জায়গায় গিয়ে আবার জীবন শুরু করতে হয়।
নারী ও শিশুদের কষ্ট সবচেয়ে বেশি। স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়, নিরাপদ পানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, আর অনেক সময় আশ্রয়কেন্দ্রেই জীবন কাটাতে হয়।
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের সাত জনের একজন হয়তো ভাঙন বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জায়গা হারাবে।
ভাঙন ঠেকাতে স্থানীয় চেষ্টা
সরকার ও কিছু সংগঠন এখন নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। নদীর পাড়ে বালুভরা বড় ব্যাগ (জিওব্যাগ) বসানো হচ্ছে যাতে পানি সরাসরি মাটি না ধুয়ে নিতে পারে। কিছু এলাকায় এভাবে ভাঙন অনেকটা কমেছে।
এছাড়া অনেক জায়গায় ঘরবাড়ি উঁচু জায়গায় তোলা হচ্ছে। নতুন বসতি গড়ে উঠছে যেখানে মানুষ সামান্য নিরাপদ থাকতে পারছে।
এই সব উদ্যোগ সত্ত্বেও নদীভাঙন থামানো যাচ্ছে না। প্রতি বছর নদী নতুন জায়গায় কামড় বসায়। মানুষ যে জমি হারায়, তা আর ফিরে পায় না।
বাংলাদেশ নিজের দোষে নয়, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই সবচেয়ে বেশি ভুগছে। অথচ কার্বন নির্গমনে দেশের অবদান প্রায় নেই বললেই চলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাঙন রোধে বড় আকারের পরিকল্পনা দরকার— যেমন নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, নদীপাড়ে গাছ লাগানো, স্যাটেলাইট নজরদারি, এবং স্থানীয় মানুষকে সরাসরি সিদ্ধান্তে যুক্ত করা।
নদীভাঙন এখন শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি মানবিক সংকটও। প্রতিটি হারানো বাড়ি, প্রতিটি উচ্ছেদ হওয়া পরিবার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়— জলবায়ুর লড়াই কেবল সংখ্যায় নয়, মানুষের জীবনে গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে নদীর সঙ্গে লড়াই নয়, নদীর সঙ্গে বোঝাপড়া করাই হবে টেকসই পথ।