মামুন আব্দুল্লাহ
আমি গত ১৫ বছর ধরে দেশের বাইরে থাকি। প্রতি বছর একবার করে দেশে আসি, আর বছরে অন্তত তিন–চারটি আন্তর্জাতিক ট্রিপ থাকে আমার। এর মধ্যে চার–পাঁচবার শেংগেন ভিসা, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র সফরও রয়েছে।
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে মালয়েশিয়া ও কাতার হয়ে ইস্তাম্বুল ফেরার পথে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এমন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম, যা আজও ভাবলে অবাক লাগে।
আমার বাসা উত্তরায়। নিয়মিত ভ্রমণকারী হিসেবে এয়ারপোর্টে সাধারণত বেশি আগে যাই না। আসলে ‘গরিব মানুষ’, লাউঞ্জের সুবিধা পাই না, তাই সময়মতোই যাই। এবারও দেড় ঘণ্টা হাতে নিয়ে পৌঁছালাম, বোর্ডিং পাস নিয়ে দ্রুত ইমিগ্রেশনে গেলাম।
ইমিগ্রেশনের দায়িত্বে ছিলেন এক মহিলা অফিসার। আমি তাঁকে পাসপোর্ট, বোর্ডিং পাস ও মালয়েশিয়ার ভিসার কপি দিলাম। যেহেতু আমার গন্তব্য তুরস্ক, সঙ্গে তুরস্কের রেসিডেন্স কার্ডও দিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “মালয়েশিয়া কি প্রথমবার যাচ্ছেন?” বললাম, “না, আগেও অনেকবার গেছি।”
এরপর তিনি পাশের এক পুরুষ অফিসারকে বললেন, “স্যার, উনার পাসপোর্টে ইউরোপ, আমেরিকার ভিসা আছে; মালয়েশিয়া যাবে, আবার থাকে তুরস্ক—কি করমু?”
পুরুষ অফিসার বললেন, “আপনি কি করবেন, সেটা আমি কিভাবে বলবো!”
তারপর মহিলা অফিসার আমাকে বললেন, “ওখানে যান।” দেখালেন সেই লাইন, যেখানে মূলত বিদেশে প্রথমবার কাজের ভিসা নিয়ে যাওয়া যাত্রীদের কাগজপত্র যাচাই হয়।
আমি অবাক হয়ে বললাম, “আমি ওখানে যাবো কেনো?” তিনি বললেন, “আসেন আমার সঙ্গে।”
আমি বললাম, “আপনি আমাকে কেনো সেখানে নিচ্ছেন?”
তিনি রেগে গিয়ে বললেন, “আপনি বেশি কথা বললে কিন্তু আমি আপনার পাসপোর্টে সীল দেব না।”
আমি শান্তভাবে বললাম, “না দিলে নাই, অন্য অফিসার দেবেন।”
তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন সেই লাইনে থাকা এক সিনিয়র অফিসারের কাছে। সেখানে গিয়ে বললেন, “স্যার, উনার ইউরোপ–আমেরিকার ভিসা আছে, তুরস্কে থাকে, মালয়েশিয়া যাবে—কি করবো?”
আমি তখন বললাম, “আমার ইউরোপ–আমেরিকার ভিসা আছে তো কি হয়েছে? আমি যাচ্ছি মালয়েশিয়া। আপনি মালয়েশিয়ার ভিসা ও টিকেট দেখবেন। আমাকে এখানে আনলেন কেনো?”
সিনিয়র অফিসারও বললেন, “উনি তো আমেরিকা গেছেন, তাহলে এখানে আনলেন কেনো?”
মহিলা বললেন, “স্যার, তাহলে ওকে করে দিই?”
তিনি বললেন, “দিন।”
মহিলা আবার বললেন, “তাহলে স্যার, আপনি লিখে দেন।”
এতে সিনিয়র অফিসার কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন, “আমি লিখে দেব কেনো? আপনার কেস আপনি নিজেই দেখবেন।”
আমি তখন মহিলা অফিসারকে বললাম, “আপনি আমার ট্রাভেল হিস্টোরি ও ডকুমেন্ট দেখে যদি না বুঝেন, জানতে চাইলে প্রশ্ন করতে পারেন। কিন্তু আমাকে এখানে আনলেন কেনো? এটা তো প্রথমবার বিদেশগামী শ্রমিকদের লাইন।”
তিনি রেগে বললেন, “আপনার পাসপোর্টে কিন্তু আমি সীল দিমু না।”
আমি বললাম, “না দিলে নাই।”
এরপর তিনি একটু নরম হয়ে কাউন্টারের দিকে যেতে যেতে বললেন, “ভাই, কিছু মনে কইরেন না। এখন অনেক ঝামেলা চলছে। ১০–১২ বছর ধইরা মালয়েশিয়ায় থাকে এমন লোককেও অফলোড কইরা দিতাছে।”
আমি উত্তর দিলাম, “কে অফলোড করবে, সেটা আমি বুঝবো। ইচ্ছামতো অফলোড করা যায় নাকি!”
শেষ পর্যন্ত তিনি আমার পাসপোর্টে সীল দিলেন।
ভাবতে পারি না, এত অভিজ্ঞ ট্রাভেলারকে তিনি এমন সন্দেহের চোখে দেখলেন! আমি যাচ্ছি মালয়েশিয়া, তিনি দেখা উচিত ছিল আমার ভিসা ও টিকিট। রিটার্ন টিকিট না থাকলে জিজ্ঞেস করতে পারতেন পরের গন্তব্য কোথায়। কিন্তু তিনি এসব বাদ দিয়ে বারবার বলছিলেন, “ইউরোপ–আমেরিকার ভিসা আছে, তুরস্কে থাকে, আবার মালয়েশিয়া যাবে!”
আরো আশ্চর্য লাগলো, তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন সেই লাইনে, যেখানে বিদেশে প্রথমবার যাচ্ছেন এমন কর্মীরা থাকে!
সময় থাকলে আমি হয়তো ইমিগ্রেশনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করতাম। মেজাজ এতটাই খারাপ হয়েছিল! নতুন কর্মকর্তা হতে পারেন, অভিজ্ঞতার অভাবও থাকতে পারে, কিন্তু এত বছরের ট্রাভেল রেকর্ড দেখে বেসিক বিষয়টা অন্তত বোঝা উচিত ছিল।
১৫ বছর আগে যখন প্রথমবার বিদেশে গিয়েছিলাম, তখন অনেক প্রশ্ন করেছিল। সেটা স্বাভাবিক ছিল—তখন তো নতুন, মাত্র এইচএসসি পাস করা ছেলে। কিন্তু এখন, এত বছরের অভিজ্ঞতা নিয়েও এমন আচরণ সত্যিই অযৌক্তিক।
শেষে তিনি বললেন, “আপনারা বুঝবেন না ভাই, আমরা অনেক ঝামেলায় আছি।”
আমার মনে হলো, যাত্রী ইউরোপ–আমেরিকা গেছে, তুরস্কে থাকে, মালয়েশিয়া যাচ্ছে—এই তথ্যগুলোই যেন তাঁর কাছে এক অদ্ভুত ঝামেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে!
বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন—এক আজব জায়গা, যেখানে যুক্তির চেয়ে বিভ্রান্তিই বেশি কাজ করে!