ফ্রান্স মানেই যেন আভিজাত্যের প্রতীক—প্যারিস, আইফেল টাওয়ার, ফ্যাশন আর আধুনিকতার ঝলক। কিন্তু দেশটিতে পা রাখলেই চোখে পড়ে ভিন্ন এক বাস্তবতা। উন্নত দেশ হয়েও ফ্রান্সের অনেক কিছুই যেন সময়ের পেছনে পড়ে আছে।
প্রথমেই চোখে পড়ে শহরের রাস্তায় হলুদ বাতি। এক ধরনের নরম, ভিন্টেজ আলো—যার তেজ এত কম যে ঠিকমতো বই পড়াও কঠিন। এমন আলো শুধু রাস্তায় নয়, অনেক বাসা-বাড়িতেও ব্যবহৃত হয়। অনেকে ধারণা করেন, ফরাসিরা নরম আলোয় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তাই উজ্জ্বল সাদা বাতির ব্যবহার তুলনামূলক কম।
আরেকটি বিস্ময়—এখনো চিঠির প্রচলন আছে ফ্রান্সে। সরকারি, বেসরকারি প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ডাকযোগে পাঠানো হয়। প্রতিটি বাড়ির সামনেই আছে ব্যক্তিগত পোস্টবক্স। অনেকের কাছে এখনো প্রতিদিন ডাকপত্র দেখা একধরনের অভ্যাস ও আনন্দের বিষয়। ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েও দেশটি তার ঐতিহ্যবাহী ডাক ব্যবস্থাকে আগলে রেখেছে, যেখানে বাংলাদেশে এই সেবা প্রায় বিলুপ্ত।
ফরাসি সমাজের জীবনযাপনেও স্পষ্ট এক ধীরগতি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজের শৃঙ্খলিত রুটিন—সকাল ৭টায় বের হওয়া, রাত ৮টার মধ্যে বাসায় ফেরা। নাইটলাইফ থাকলেও তা সীমিত এবং ব্যক্তিনির্ভর। কাজের বাইরে বেকার সময় কাটানো বা আড্ডায় সময় নষ্ট করার সংস্কৃতি এখানে নেই।
তবে এই সরলতা একঘেয়েমি নয়। বরং এখানকার মানুষ সময় কাটায় হাঁটাহাঁটি, বই পড়া, কিংবা ঐতিহ্যবাহী খেলা বোলস বা পেটাঙ্ক খেলে। পার্কে কুকুর নিয়ে হাঁটা, নদীর তীরে বই পড়া, কিংবা সূর্যের তাপে বসে থাকা—এইসবই তাদের দৈনন্দিন দৃশ্য।
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ফরাসিরা ব্যতিক্রমী। ফেসবুক নয়, বরং ইনস্টাগ্রামই তাদের প্রিয় মাধ্যম। তবে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতটা সময় ব্যয় করে না। ক্লাস শেষে বাচ্চারা এখনো বাইরে খেলতে যায়, পুলে সাঁতার কাটে—যা আধুনিক বিশ্বের অনেক দেশেই হারিয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে ফ্রান্সে জীবন অনেক ধীর, কিন্তু শান্ত। ধুলোবালিমুক্ত রাস্তায় রাতে নির্ভয়ে হাঁটা যায়, চুরি বা ছিনতাইয়ের ভয় ছাড়াই। দেশটির অতিথিপরায়ণ মানুষ, সহযোগিতার মনোভাব ও প্রকৃতির নরম সৌন্দর্য একে করে তুলেছে অন্যরকম।
কেউ কেউ ফ্রান্সকে ‘সেকেলে’ বলবেন, কেউবা বলবেন—এই ধীর জীবনই আসল পরিশুদ্ধ জীবন। সব মিলিয়ে, ফ্রান্স এক ছবি—যেখানে আধুনিকতা আর ঐতিহ্যের রঙ মিলেমিশে এক স্নিগ্ধ সৌন্দর্যে রূপ নিয়েছে।
মেহেদী হাসান রিফাত
ফ্রেঞ্চ প্রবাসী