ইদি আমিনের নীরবতা আর হাসিনার কোটি টাকার পিআর

মারুফ আহমেদ

১৯৭৯-এর এপ্রিল; এন্টেবে বিমানবন্দর থেকে উড়াল দেওয়া একটি সৌদি বোইং-৭২০-এর ভেতরে বসে ইদি আমিন তাকিয়ে ছিলেন জানালার বাইরে। নিচে উগান্ডা —যে দেশটির প্রায় চার লাখ নাগরিককে তিনি নিজেই পাঠিয়েছিলেন কবরে। ক্ষমতা হারিয়ে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরশাসকের পকেটে ছিল না কোনো সেনাবাহিনী, না কোনো কূটনৈতিক সহায়তা—ছিল কেবল দু’টি স্যুটকেস, একটা রেডিও আর ভয়। এরপর রিয়াদের গৃহবন্দী জীবন; কোনো সাংবাদিক সম্মেলন, কোনো ইমেইল—কিছুই নয়। ২০০৩-এ হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যু; পৃথিবীর খবরের কাগজগুলোতে চার লাইনের ছোট্ট একটা নিউজ—‘Former Ugandan dictator dies in exile’।

পঁয়তাল্লিশ বছর পর একই রকম পালানোর ঘটনা আমরা আবার চাক্ষুস করলাম। ২০২৪-এর আগস্ট; ঢাকা থেকে বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ ফ্লাইট নিয়ে গেল শেখ হাসিনাকে। পেছনে পড়ে রইল হাজারো লাশ, নিখোঁজের তালিকা, লুট হয়ে যাওয়া ব্যাংক—আর একটি দেশের ক্ষতবিক্ষত রাজপথ। কিন্তু এবার গল্পটা আলাদা; কারণ বিমান ওঠার সঙ্গে সঙ্গে চালু হয়ে গেল টাকার প্রিন্টার, আইনজীবীদের ফোন, পিআর এজেন্সির ব্রিফ—‘Image-rebuilding mission starts now’।

ইদি আমিনের মতো হাসিনাও নির্বাসিত, তবে ইদি আমিন ছিলেন আর্থিকভাবে নিঃস্ব। হাসিনার অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি ডলার; সুইস ব্যাংক থেকে দুবাই, দুবাই থেকে সিঙ্গাপুর—সবখানেই নগদ-সম্পদ, বেনামি কোম্পানি। সেই টাকার বলেই ওয়াশিংটন-লন্ডন-নয়াদিল্লির বিলাসবহুল ল ফার্মগুলোর সভাকক্ষে চলছে ম্যারাথন বৈঠক। টার্গেট একটাই—আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যেন ‘হাসিনা ব্র্যান্ড’-কে মানবাধিকারের প্রতীক হিসেবে দাঁড় করানো যায়।

প্রতি সপ্তাহে কয়েকটি নির্দিষ্ট মিডিয়া হাউসের ইনবক্সে পৌঁছে যায় একই টেমপ্লেট—‘Exclusive: Sheikh Hasina breaks silence’। প্রশ্নগুলো আগেই ঠিক করা, উত্তরগুলো লিখে দেন পিআর কনসালট্যান্ট; শুধু নিচে থাকে একটা স্ক্যান করা স্বাক্ষর। কেউ জানে না লেখাটা তিনি পড়েছেন কি-না; তবে ছাপা হয়, কারণ বিজ্ঞাপন বাজেট বেশ মোটা অংকের।

ইদি আমিন যখন নিঃশব্দে মরে গেলেন, তখন পৃথিবীর মানচিত্রে একটা কালো দাগ মুছে গেল। হাসিনা অবশ্য নতুন কৌতূহল তৈরি করছে—‘Will she come back? Can money buy innocence?’ উত্তরটা দিচ্ছে সময়, তবে সূত্র ধরে চলা আগুনের খবরগুলো বলছে ভিন্ন কথা।

আদালতের রায় ঘোষণার আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও অন্যান্য জেলায় বাসে আগুন; টেলিগ্রাম চ্যানেলে ফাঁস হওয়া স্ক্রিনশটে দেখা যায়—‘Plan-B: create chaos, shift narrative’। একই কৌশল ২০১৩-১৪-তে; তখন বিএনপি-জামায়াতের ডাকে হরতাল-অবরোধ, পেট্রলবোমা। এবার অভিযোগের তীর আওয়ামী লীগের দিকে। পার্থক্য—২০১৪-তে তাদের ছিল ক্ষমতা, এখন নেই; তখন ছিল রাষ্ট্রযন্ত্র, এখন আছে কেবল টাকা আর নস্টালজিয়া।

বিএনপি ২০১৪-র সহিংসতায় জনসমর্থন হারিয়েছিল; আওয়ামী লীগ ভাবছে এবার ‘উল্টো পথে হাঁটলে’ ফল পাল্টে যাবে। কিন্তু স্মার্টফোনের যুগে মানুষ আর বিশ্বাস করে না ‘আগুনে পুড়ে গেল বিরোধী দল’—তথ্যের ধারাপাতে সবাই জানে, কে কখন কেরোসিন ঢালল। তাই নতুন প্রজন্মের প্রশ্ন—‘আপনারা টাকা খরচ করেন ইমেজ বাঁচাতে, আমরা কিন্তু মনে রাখি আমরা কতজনকে হারিয়েছি।’

ইদি আমিনের কফিনে কেউ ফুল দেয়নি; হাসিনার পিআর টিম চাইছে তার ছবিতে ফুলের তোড়া জমুক । কিন্তু টাকা যতই ঢালুক, একটা সহজ হিসাব মনে রাখে দেশ—‘নিঃস্ব স্বৈরশাসক একদিন নিঃশব্দে মরে যায়, আর টাকাওয়ালা স্বৈরশাসক হয়তো শব্দ করে বাঁচতে চায়; কিন্তু ইতিহাসের কাছে দুজনেই খুনি।’

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *