বিজয় মজুমদার
আমার শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদের সঙ্গে প্রথম পরিচয় দিনাজপুর শিশু একাডেমীতে—যদিও সরাসরি নয়। তখন আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি, সময়টা ১৯৮৩ সাল। শিশু একাডেমীর ইয়াসমীন আপার সৌজন্যে একদিন হাতে পেলাম একটি গল্পের বই—‘নীল হাতি’। তিনি অনেকটা জোর করেই বইটি ধরিয়ে দিয়েছিলেন আমার হাতে। আর সেই বই পড়েই আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। নীলুর নীল হাতি আমাকে দীর্ঘদিন আলোড়িত করে রেখেছিল।
বইটি শুধু মুগ্ধই করেনি, লেখক হুমায়ুন আহমেদ সম্পর্কে গভীর আগ্রহ জাগিয়েছিল আমার মধ্যে। বন্ধুর নাম তারিক ইকবাল, ওর ডাকনাম সবুজ নাম্বার ওয়ান। ওর বাবার বাসায় একদিন পড়েছিলাম ‘নন্দিত নরকে’। সবুজের বাবা, দিনাজপুরের বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ জনাব মেহেরাব আলী। তাঁর বাড়িতে ছিল এক বিশাল লাইব্রেরি—বইপ্রেমী মানুষদের এক আশ্রয়। হুমায়ুন আহমেদের বইয়ের টানে আমি প্রায়ই ওদের বাসায় যেতাম।
হুমায়ুন আহমেদকে আমার আরও কাছে নিয়ে এলেন জনাব শাহনেওয়াজ। দিনাজপুরে একসময় ‘শাহনেওয়াজ লাইব্রেরি’ ছিল শহরের সবচেয়ে বড় বইয়ের দোকান। গল্পের বই বিক্রি করলেও তিনি তাঁর দোকানে পাঠকদের বসে পড়তে দিতেন সদ্য আসা হুমায়ুন আহমেদের টাটকা বইগুলো—ফ্রিতে! সেই দোকানে বসেই একদিন এক কেজি আলুর বদলে সাতশো গ্রাম আলু কিনে বাকি টাকায় কিনে ফেললাম ‘বোতল ভুত’। এটাই আমার জীবনের প্রথম নিজের (মানে মায়ের দেওয়া বাজারের টাকা মেরে কেনা) গল্পের বই।
একবার হুমায়ুন আহমেদের বই পুরস্কার হিসেবেও পেয়েছিলাম। এজন্য ধন্যবাদ দিতে হবে আমার বন্ধু, তখনকার দিনাজপুর সরকারি কলেজের সাহিত্য সম্পাদক মেহেবুব আলম ও বাংলা বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক কাওসার আলম স্যারকে। কলেজের সাহিত্য প্রতিযোগিতায় দুটি বিভাগে প্রথম হবার সুবাদে পুরস্কার হিসেবে দুটি বই আমি নিজেই বেছে নিয়েছিলাম।
একদিন শাহনেওয়াজ লাইব্রেরীতে বসে বই পড়ছি। এমন সময় মেহেবুব ও কাওসার আলম স্যার এলেন—উদ্দেশ্য সাহিত্য প্রতিযোগিতার পুরস্কার হিসেবে বই কেনা। আমি মেহেবুবকে বললাম, —আমি এই দুটি বই নিতে চাই। সে একটু চিন্তায় পড়ল, “তাহলে বাজেটের হিসাব মেলাতে হবে।” প্রতিটি পুরস্কারের জন্য বাজেট ১০০ টাকা। কিন্তু আমার পছন্দের দুটি বইয়ের দাম একটির ৫০ আর অন্যটির ১৫০ টাকা।
মেহেবুব নীতিবান ছেলে। আমি তাকিয়ে আছি ওর দিকে, তারপর স্যারের দিকে। স্যার হাসতে হাসতে বললেন, “আরে, নিপাতনে সিদ্ধ বলে তো একটা কথা আছে! আপত্তি তুলবে কে? তোমারই তো বন্ধু!” তারপর স্যারের সম্মতিতেই আমি পেয়ে গেলাম দুটি বই—‘ময়ূরাক্ষী’ ও ‘হুমায়ুন আহমেদের গল্পসমগ্র’। এখন আর বই দুটি আমার কাছে নেই, তবে যিনি এখন এগুলোর মালিক, তিনি যে উত্তম পাঠক—এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।
এরপর আমার সেই প্রিয় লেখকের সঙ্গে একবার সরাসরি দেখা হয়েছিল—যে স্মৃতি আমার জীবনে অমলিন। এজন্য কৃতজ্ঞ আমি জসীম ভাই ও তালেয়া রেহমান ম্যাডামের প্রতি।
১৯৯৫ সালে বাংলা একাডেমীর একুশে বইমেলায় ‘যায় যায় দিন’ প্রকাশনী একটি স্টল দেয়। আমাকে সেখানে কাজের সুযোগ করে দেন জসীম ভাই। একদিন স্টলে বসে আছি, এমন সময় তালেয়া রেহমান ম্যাডাম বললেন, “চল, আমার সঙ্গে।” তাঁর হাতে একটি বই—‘লেখালেখি’। লেখকদের জন্য লেখা বইটির লেখিকা তিনি নিজেই। সেই বইটি তিনি হুমায়ুন আহমেদকে উপহার দিতে চান।
আমাদের স্টলের ঠিক বিপরীতে ছিল কাকলী প্রকাশনী। সেখানে নিজের বইয়ে স্বাক্ষর দিচ্ছিলেন হুমায়ুন আহমেদ। প্রচণ্ড ভিড়। ম্যাডামের ‘বডিগার্ড’ হয়ে আমি ভিড় ঠেলে তাঁকে পৌঁছে দিলাম আমার প্রিয় লেখকের সামনে। উনি আমার দিকে তাকিয়ে খেয়াল করলেন, পেছনে তালেয়া ম্যাডাম। সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন। হাসিমুখে বইটি গ্রহণ করলেন। আমরা স্টলে ফিরে এলাম, মনে হচ্ছিল যেন কোনো বিশাল জয় ছিনিয়ে এনেছি।
পরদিন স্টলে বসে বই দেখাচ্ছি আগ্রহী পাঠকদের। হঠাৎ দেখি দূর থেকে হুমায়ুন আহমেদ আমাকে ইশারা করছেন। প্রথমে বুঝতে পারিনি। পরে ডেকে উঠলেন, “এই ছেলে, একটু শুনবে?”
আমি প্রায় লাফিয়ে ছুটে গেলাম তাঁর কাছে।তিনি বললেন, “বাবা, কিছু মনে করো না। তোমার নাম জানি না। একটা হেল্প করবে?”
বললাম, “অবশ্যই, স্যার!”
তিনি কয়েকটি বই হাতে তুলে দিয়ে বললেন, “এই বইগুলো নিয়ে আমার সঙ্গে একটু চলো।”
তিনি সোজা হাঁটলেন আমাদের স্টলের দিকে—‘যায় যায় দিন’-এর স্টল। তালেয়া ম্যাডাম অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। হুমায়ুন আহমেদ তাঁকে সব বই উপহার দিলেন। আমার দিকে তাকিয়ে শুধু বললেন, “তোমাকে একটু কষ্ট দিলাম, কিছু মনে করো না।”
আমি মনে মনে বললাম, “কিছু মনে করব না, স্যার—এই মুহূর্ত আমি আজীবন মনে রাখব।”
আজ আমার সেই প্রিয় লেখকের জন্মদিন।
ওপারে ভালো থাকবেন, স্যার।
আপনার অজস্র লেখা আমার জীবনে যে আনন্দ এনে দিয়েছিল, তার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।