নীরবে বিশ্বজয় করছে বাংলাদেশের অপ্রচলিত রপ্তানি পণ্য

 

বাংলাদেশের রপ্তানির গল্প শুরু হয়েছিল পাট দিয়ে। স্বাধীনতার পর বহু বছর ধরে পাট ও পাটজাত পণ্যই ছিল বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস। কিন্তু সময় বদলেছে। একসময় সেই জায়গা দখল করে নেয় তৈরি পোশাক শিল্প, আর এখন সেটিই বাংলাদেশের রপ্তানির মেরুদণ্ড। পোশাক শিল্প একাই বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রায় আশি শতাংশের বেশি এনে দিচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে এক অনন্য সাফল্য, কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।

দেশের ভেতরে আরও অনেক শিল্প নীরবে নিজেদের জায়গা তৈরি করছে, যেগুলোর নাম অনেকের কাছেই অপরিচিত। রপ্তানির তালিকায় এখন সাতশোরও বেশি পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে এমন সব জিনিসও আছে, যেগুলো শুনলে অবাক হতে হয়। যেমন— বাংলাদেশ এখন সাইকেল রপ্তানি করে বছরে প্রায় ১৬০ মিলিয়ন ডলার আয় করছে। ইউরোপের রাস্তায় “Made in Bangladesh” লেখা সাইকেল চলছে গর্বের সঙ্গে। এমনকি গলফ খেলার ব্যাটের শাফ্ট— যেটা শুনলেই বিলাসবহুল দেশগুলোর কথা মনে আসে— সেটিও তৈরি হচ্ছে এখানেই, এবং রপ্তানির পরিমাণ ১০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

তবে এসবই কেবল শুরু। বাংলাদেশ থেকে এখন বিদেশে যাচ্ছে নারিকেলের খোল, হাঁসের পালক, কাজুবাদাম, লুঙ্গি, চশমার ফ্রেম, মশারি, পাঁপড়, পরচুলা, চারকোল— এমন সব পণ্য, যেগুলোকে একসময় “ছোটখাটো” বলে অবহেলা করা হতো। কিন্তু এই ছোটখাটো পণ্যই এখন কোটি কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা এনে দিচ্ছে।

একটি বাস্তব উদাহরণই যথেষ্ট বোঝাতে পারে পরিস্থিতি কতটা বদলাচ্ছে। সম্প্রতি একটি বাংলাদেশি কোম্পানি ইনসুলেটর তৈরির মাধ্যমে রপ্তানিতে প্রবেশ করেছে। এই খাতে তারা বিদেশ থেকে পেয়েছে প্রায় ১৪০ কোটি টাকার বিনিয়োগ। অর্থাৎ, তৈরি পোশাকের বাইরে দেশের উৎপাদনশীলতা ও উদ্ভাবন নিয়ে এখন বৈশ্বিক আগ্রহ বাড়ছে।

তবুও অর্থনীতিবিদরা একমত— এখনো বাংলাদেশের রপ্তানি ‘সেভেন প্রোডাক্ট ডিপেন্ডেন্ট’। অর্থাৎ, মোট রপ্তানির প্রায় ৯৪ শতাংশ আসে মাত্র সাতটি পণ্য থেকে। এই অতি-নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, একটিমাত্র পণ্য বা কিছু নির্দিষ্ট বাজারে নির্ভর থাকলে, বৈশ্বিক কোনো পরিবর্তনেই বড় ক্ষতি হতে পারে। তাই এখন সময় এসেছে পণ্য বৈচিত্র্য আনার, যাকে অর্থনীতিবিদরা বলেন “এক্সপোর্ট ডাইভারসিফিকেশন”।

এই বৈচিত্র্য আনতে গেলে সামনে কিছু বাধাও আছে। নতুন উদ্যোক্তারা রপ্তানির সুযোগ খুঁজে পেলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, শুল্কনীতি, এবং নানান অনুমোদনের জটিলতায় অনেক সময় পিছিয়ে পড়েন। বন্দর ও লজিস্টিক সমস্যাও রয়েছে— পণ্য সময়মতো পাঠানো যায় না, ফলে বিদেশি ক্রেতারা অনেক সময় নির্ভরতা হারান। তাছাড়া, অনেক উদ্যোক্তা এখনো জানেন না, কোন অপ্রচলিত পণ্যের বৈদেশিক বাজার কোথায়, বা কোন দেশে কী ধরনের চাহিদা আছে।

একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বলছিলেন, “আমি যখন প্রথম পরচুলা রপ্তানি করতে চাইলাম, তখন কাস্টমস অফিসারই জানতেন না, এটি কোন ক্যাটাগরির পণ্য!”— এই কথাতেই বোঝা যায়, সচেতনতা ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি কতটা।

তবু আশার আলোও জ্বলছে। বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তারা এখন নতুন খাতে পা রাখছেন। খুলনায় কেউ চিংড়ি আর মধু নিয়ে বিদেশে বাজার ধরছেন, রাজশাহীতে কেউ সিল্ক আর আমকে বিশ্ববাজারে তুলে ধরছেন, কক্সবাজারে কেউ নারিকেলজাত পণ্য রপ্তানি করছেন, ময়মনসিংহে কেউ হাঁসের পালক দিয়ে হালকা শিল্প গড়ে তুলছেন। এই অঞ্চলভিত্তিক পণ্যের উত্থানই হতে পারে দেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক বিপ্লব।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার যদি অপ্রচলিত পণ্যে প্রণোদনা বাড়ায়, যেমন— কর ছাড়, রপ্তানি সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও লজিস্টিক সুবিধা— তাহলে আগামী দশ বছরে বাংলাদেশের রপ্তানির মানচিত্র পুরোপুরি বদলে যেতে পারে। এর সুফল হবে বহুমাত্রিক: নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়বে, অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল হবে।

ইতিমধ্যে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে “Bangladesh Eco Products” নামে একটি ব্র্যান্ড-ধারণা গড়ে উঠছে। পশ্চিমা ক্রেতারা এখন এমন পণ্য খোঁজেন, যা পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও সাশ্রয়ী। বাংলাদেশ যদি এই চাহিদা বুঝে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে পোশাকের পর এবার অপ্রচলিত পণ্যই হয়ে উঠবে নতুন রপ্তানির নায়ক।

আজ তৈরি পোশাক আমাদের বিশ্বে পরিচিত করেছে। কিন্তু কাল হয়তো বাংলাদেশের সাইকেল, চশমার ফ্রেম, কাজুবাদাম বা পরচুলাই বিশ্ববাজারে “ব্র্যান্ড বাংলাদেশ”-এর নতুন চেহারা গড়ে তুলবে।

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *