ভাড়া বাসার বারান্দায় সবুজের স্বপ্ন ও বরকত আলীর পুরস্কার

মারুফ আহমেদ

নিজের বাড়ি না থাকলে, ভাড়া বাসায় গাছ লাগানোর যে ইচ্ছে, তা খুব কঠিন! রাজধানীর বুকে অনেকের এই শখ চোখে পড়ে, প্রায় প্রতিটি বাড়ি ঘেষেই রয়েছে ছোট বড় বেলকনির কালচার, অনেকের থাকে বিশাল ছাদ, কারও বা নিচতলা বাড়ির সামনে খোলা চত্বর, এক চিলতে রোদে সবুজের সমারোহে আকুলতা কারও মনকে নাড়া দেয়!

সেই আক্ষেপে বেশি পুড়েন শহরের হতভাগা ভাড়াটিয়া শ্রেণীর মানুষেরা …

সব বাড়িওয়ালা-ই যে আপনার মন-মানসিকতা সম্পর্কে ধারণা রাখবে, তা ভুল, আপনার সৃষ্টিশীলতাকেও যে বাহবা দিবেন, সেই প্রত্যাশাও অনেক সময় কষ্টে ভুগায়!

আপনি-আমি ভাড়া থাকছি, এটা নিরাপদ আশ্রয়ের বিষয়, কিন্তু আপনার মন নামের যে স্বত্তা আপনাকে প্রকৃতির দিকে টেনে নিচ্ছে, তা কল্পনাপ্রসূত মন ভাল রাখার আহ্বান, এমন  মানুষের সবুজ ভাল লাগে, প্রকৃতি ভাল লাগে, আর তাই- আপনি গাছ লাগাবেন, ঘরকে হালকা একটু এডভেঞ্চার জীবনে নিয়ে আসতে চাইছেন! আপনার এক টুকরো সবুজ উদ্যানে পাখপাখালিরাও আপনার প্রতিবেশী, ওদের নিয়েই গড়ে ওঠে আপনার অন্যরকম এক জীবন …

কিন্ত

অনেক সময় দেখা যায়, ভাড়াটিয়া বনাম বাড়িওয়ালার মধ্য এসব নিয়ে শুরু হয় মতানৈক্য! ‘বাড়িওয়ালা’ খ্যাত মানুষটির কাছে আপনার ‘টারজান জীবন’ হয়ে পড়ে পুরোই তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের কারণ! এই দেশের কৃষ্টিতে এই বিভেদে দেখা যায়- ভাড়াটিয়ার স্বভাভ, ‘আমি টাকা দিয়ে থাকি, যা খুশি তাই করব অন্যের বাড়িতে,’ এই নীতিতে মাসের পর মাস, কেউ বছরের পর বছর কাটিয়ে দিচ্ছেন, আর বাড়িওয়ালাকে দেখা যায়, চিরাচরিত সিনেমার ভাষায়-এমন একরোখা ভাড়াটিয়াকে বলছেন-“ সামনের মাসেই আমার বাসা খালি করবেন”

ভালো বাসা আর ভালোবাসা দুটোই-এই শহরে পরিপূরক কথন, ভাগ্যক্রমে-কোন বাড়িওয়ালা যদি প্রকৃতিপ্রেমী হন, তবেই আপনার মনের ঘরে এক চিলতে উদ্যান সম্ভব! আর এর ব্যতয় হলে, আপনার অভিলাষ জায়গাতেই-কট!

ঠিক, বরকত সাহেবের মতন …ধরুন, ৪ তলা, ৫ তলা, ৬ তলা, বা বহুতল ভবনে আপনি মাটি, টব কিংবা বড় বড় ড্রাম টেনে টুনে তুললেন, টাকাও খরচ করলেন অঢেল! মনের সুখে অন্যের বাড়ি ভরে দিলেন সবুজগাছের সারিতে! বরকত সাহেবের একার জন্য কি শুধু অক্সিজেন দরকার? মানুষটা সময়, টাকা পয়সা, শাররিক পরিশ্রম সব কিছুর বিনিময়ে প্রাণভরে ভাড়া বাসায় অক্সিজেন নিচ্ছেন রোজ, এইতো শান্তি! কয়দিন যেতে না যেতে-ই;

বিনামূল্যের অক্সিজেন প্রাপ্তীতে দেখা দিলো বিপত্তি!

দেখা গেল- বরকত সাহেবের বেরসিক বাড়িওয়ালা বলে বসলো-

“ এইটা আমার বাড়ি, কোন বনজঙ্গল না, এইখানে এসব চলবে না…”

বেচারা শহরের এই বাড়িটিতে অনেকদিন থেকেই ভাড়া থাকেন, বছরের পর  বছর ধরে বড় তেলের বোতল কেটে নানান জাতের ফলের চারা লাগিয়েছেন, যা দিনকাল, ঢাকায় তো জমিজমা কেনা দুস্কর, ইচ্ছে আছে গ্রামে এক টুকরো জমি যদি কপালে জুটে কখনও তখন এই চারাগাছ নিয়ে নিজ জমিতে রোপন করবেন, কিন্তু বেরসিক বাড়িওয়ালা লোকটাকে কে বোঝাবে, মানুষটা বুঝতেই চায় না, বারান্দায় লাগানো এসব চারাগাছ নাকি ঘরবাড়ি শেষ করবে! তা করতেই পারে-কেননা, বাড়ির নাম কিনা, ‘স্বণ মহল’…

সবুজায়ন নিয়ে পড়ে থাকা বরকত সাহেবের রিসাচজোনে প্রায় শতাধিক বিলুপ্তপ্রায় গাছ ছিল, বছরের পর বছর ধরে একজন সবুজপ্রেমী মানুষ গাছ সংগ্রহ করে চলেছেন, গাছ লতা পাতা নিয়ে নিরলস কাজ করা বৃক্ষপ্রেমীকে  বাড়িওয়ালা বাসা ভাড়া দেয়ার সময় কিচ্ছুটি বলেননি, সে কারণেই মহানন্দে বরকত আলী পুরো বারান্দাজুড়ে একপ্রকার সবুজাভ পরিবেশ তৈরি করেন, প্রকৃতি ও পাখ পাখালির সাথেও খুব অল্প সময়ের মধ্যে মানুষটার এক ধরণের আত্মিক সম্পক গড়ে ওঠে! পাখিরা বাচ্চা দেয়, বরকত সাহেবের কিনে আনা মাটির হাড়িতে! দিনরাত কিচ মিচ কিচির মিচির সংগীতে সারা বাড়িতে বিধাতার এই পেয়ানোর সুর, মুছনা, সারাদিনের অফিসের ক্লান্তি অবসাদ সব ভুলে যান এই ভাড়াটে স্থুলকার মানুষটা! অথচ ককশ বাড়িওয়ালা বরকত আলীর ব্যবিলনকে দুষছেন, আজাইরা সব গাছগাছালির কারণে নাকি পাখিরা বাড়িটিতে দিনরাত ক্যাচক্যাচ করছে …

দাপুটে বাড়িওয়ালা আর সহ্য করতে না পেরে, একদিন বলেই বসলেন-

‘’১২ দিন সময় দিলাম, বারান্দা খালি করেন…”

পাখির কলরব ভাল লাগে না, এমন মানুষও পৃথিবীতে বিরল!

একটা সামান্য ইস্যুর সাথে আরও বেশকিছু নিষেধাজ্ঞা জুড়ে দিয়ে চলে গেলেন বাড়িওয়ালা …

১২ দিন সে ম্যালা সময়, ৩ দিনের মাথায় এত শখের সংগৃহীত গাছ সব মানুষকে ডেকে ডেকে বিনামূল্যে দিয়ে দিতে হবে? বুকটা মোচর মারে বরকত আলীর, আজ নিজের এক টুকরো জমি থাকতো, গাছ সব একটা পিকাপ ভাড়া করে নিয়ে যাওয়া যেত? ৪ তলা থেকে ৮৪ বার নিচে নেমে নেমে বুকের কাছে ধরেই সবুজ গাছ সব নামিয়ে দিলেন মানুষটা!

৮৪ টি গাছ ঘন্টাখানিকের ভেতর নিচে নামানো হলো…শরীর থেকে টুপটুপ ঘাম পড়ছে, হাত ও পায়ের মাসলস্ ব্যাথায় টনটন করছে, তবু ইচ্ছেটাকে মরতে দেয়া যাবে না?

৮০০ টাকায় ভ্যান ঠিক করে ৩ ট্রিপে সব গাছ নিয়ে গেলেন পাশের এক বিদ্যালয়ের মাঠে!

খুব যত্নের সাথে সারিবদ্ধভাবে গাছগুলি রাখা হলো-

দপ্তরি অবাক! স্কুলের অভিভাবক আজ এখানে গাছের মেলা বসালেন? তিনি কি নাসারী ব্যবসা করেন? গাছ বিক্রি করে মেয়েকে মানুষ করছেন বরকত ভাই …

হাসলেন বরকত আলী, না তোতাভাই, এগুলো বিক্রি করব না, স্কুল ছুটির পর, সব বিনামূল্যে বিতরণ করে দিও…

দপ্তরি তোতার বুকটা ভরে উঠলো! বৃক্ষপ্রেমি একজন মানুষ আজ নিজ চোখে দেখলেন! আজ তোতা মনের ভুলে ১০ মিনিট আগেই ছুটির ঘন্টা বাজিয়ে দিলো-সবাই একটি করে সবুজ গাছ নিয়ে বাড়ি যাবে! এই দৃশ্য দেখার লোভ বিদ্যালয়ের কমচারী ধরে রাখতে পারলেন না!

দুর থেকে দাঁড়িয়ে এই বিশেষ মুহূতটি তিনি নিজের মোবাইলে ধারণ করবেন বলে প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু চোখের কোনে দু’ফোটা আনন্দাশ্র’ থমকে দিলো, বরকত আলীর মনের পৃথিবীকে-এই পৃথিবী শুধু সবুজ আর সবুজ ঠেকছে কেন?

শিশুরা কোলের ওপর একটি একটি চারা নিয়ে যাচ্ছে বাড়িতে, শিশুদের সাথে সবুজের পরিচয় ঘটে গেল মনে হয়?

একজন পাগলাটে বরকত আলীর জীবনে এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কিছু নেই …

 

লেখক:  সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *