কপ৩০–এ জলবায়ু সুবিচারের প্রশ্ন: ব্রিটিশ এমপিদের সামনে বাংলাদেশের বাস্তব অভিজ্ঞতা

সোহানুর রহমান

আমাজনের প্রান্তে দাঁড়িয়ে কপ৩০–এর আলোচনায় এখন একটাই শব্দ ঘুরছে—জলবায়ু অর্থায়ন। এই বৈশ্বিক সম্মেলনের ব্যস্ততার মাঝেই ব্রিটেনের তিন প্রধান দলের সাংসদদের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠ এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। উদ্দেশ্য ছিল সরাসরি: জলবায়ু–ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে অর্থ কতটা পৌঁছায়, কোথায় গিয়ে আটকে থাকে, আর সেই জট কীভাবে খোলা যায়।

বৈঠকের নেতৃত্বে ছিলেন যুক্তরাজ্যের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত এবং ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইন্সটিটিউটের পরিচালক মেলানি রবিনসন। তাঁর পরিচালনায় তৃণমূলের বাস্তব অভিজ্ঞতা একের পর এক উঠে আসছিল—মানুষের লড়াই, দীর্ঘদিনের অনুযোগ এবং প্রত্যাশা।

আমি একটাই কথা বলেছি—জলবায়ু অর্থায়নে সুবিচার, স্বচ্ছতা এবং স্থানীয় মানুষের নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে। বরাদ্দের অর্থ যেন দপ্তরের ফাইলে মাসের পর মাস আটকে না থাকে। জলবায়ু বিপর্যয়ের গতি যে দ্রুত, আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি সে ক্ষতি থামাতে পারে না। স্থানীয় নেতৃত্ব থাকলে কাজ চোখে দেখা যায়—এটি বোঝাতে ঢাকার করাইলের মানুষের নেতৃত্বে রিওয়েট জলাভূমি পুনরুদ্ধারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছি। জলবায়ু–ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ নিজেরাই জলাভূমি ফিরিয়ে এনে জীবিকার পথ খুলে দিচ্ছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে আফ্রিকা ও এশিয়ায় ধ্বংসপ্রাপ্ত পরিবেশ পুনর্গঠন (রেডা)–সমর্থিত আন্তর্জাতিক কর্মসূচির সহযোগিতায়; সঙ্গে রয়েছে যুক্তরাজ্যের পরিবেশবিষয়ক থিংকট্যাংক আইআইডি এবং যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন দপ্তর এফসিডিও।

আরো বলেছি—জলবায়ু অর্থায়নের স্থায়িত্ব জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া সম্ভব নয়। ব্রিটিশ কাউন্সিল ও ব্রিটিশ হাই কমিশনের সহায়তায় ইয়ুথনেট কীভাবে সামাজিক নিরীক্ষার মাধ্যমে জলবায়ু অর্থায়ন পর্যবেক্ষণ করেছে, সেই অভিজ্ঞতাও শেয়ার করেছি। কারণ আন্তর্জাতিক সহায়তা সঠিক মানুষের হাতে পৌঁছালে তার ফল তৃণমূলে স্পষ্ট দেখা যায়। একই সঙ্গে স্থানীয় অভিযোজন উদ্যোগ, যুব নেতৃত্বের কাজ এবং সুন্দরবনের বাঘ–বিধবা নারীদের নিয়ে সচেতনতা তৈরির অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছি। ম্যানচেস্টারের ক্লাইমেট থিয়েটার এরগনের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে কীভাবে এই নারীদের গল্প যুক্তরাজ্যে পৌঁছে দিতে পেরেছি, সেটিও জানিয়েছি।

ফিজি, পেরু, ব্রাজিল, জাম্বিয়া ও কেনিয়ার প্রতিনিধিরা তাঁদের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন—বন সংরক্ষণ, শহুরে অভিযোজন, আদিবাসীদের ভূমি অধিকার এবং স্থানীয় নেতৃত্বের নানা দৃষ্টান্ত। আলোচনায় উঠে এসেছে আমাজন অঞ্চলে যুক্তরাজ্য–অর্থায়িত একটি বড় প্রকল্পের কথাও, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভূমি সুরক্ষা ও বনশাসন জোরদার করছে।

কিন্তু এখানেই প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক স্পষ্ট। বিশ্ব সম্প্রদায় আগামী দশকে বিপুল অর্থ জোগাড়ের কথা বলছে, অথচ তহবিল ছাড়তে দেরি হওয়ার কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের মতো দেশ—যেখানে নদীভাঙন, লবণাক্ততা, বাস্তুচ্যুতি ও খাদ্য–সংকট প্রতিদিন বাড়ছে।

এই অবস্থায় আমাদের প্রশ্ন সরল: ব্রিটেন কি সামনে এসে নেতৃত্ব দেবে? বৈঠকের শেষে আমরা ব্রিটিশ সাংসদদের আহ্বান জানিয়েছি, জলবায়ু অর্থায়ন এখনই ন্যায্যতার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করতে হবে। কারণ দূষণের দায় বড় দেশগুলোর; কিন্তু বিপর্যয়ের বোঝা বহন করছে আমরা।

কপ৩০ এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে। এখানকার সিদ্ধান্তই ঠিক করবে আগামী দশকের জলবায়ু সুবিচারের পথ। ব্রিটেন সত্যিই এগিয়ে আসবে কি না—এই উত্তর এখন সবার অপেক্ষায়।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *