আওয়ামী লীগ: ভাঙনের মুখে দল, অনিশ্চয়তার পথে ভবিষ্যৎ

 

সামসুল আরিফ বিপু

আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরও দলটি রাস্তায় তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেনি। এই নিস্তব্ধতার পর এখন নতুন করে ভাবতে হচ্ছে—দলের মাঠের শক্তি আসলে কতটুকু। কয়েকটি হাত বোমা, গাড়িতে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা এবং কিছু পেশাজীবী সংগঠনের বিবৃতি ছাড়া দলটি স্তব্ধ। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার বিবৃতি ফিরিয়েও নিয়েছে। নীরবতাই যেন বড় ছবি এঁকে দিচ্ছে। বাংলাদেশে কোনো প্রধান দল এত দ্রুত শক্তি হারায়নি।

২০১৪ সালে বিএনপি–জামায়াতের আন্দোলনকে অকার্যকর বলা হলেও তাদের বিস্তৃতি ছিল বিস্ময়কর। তখন রাজধানী ছিল প্রায় বিচ্ছিন্ন, আর ঢাকার বাইরে বহু এলাকায় ছিলো তাদেরই প্রভাব। সেই অবস্থার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করলে দেখা যায়—আজ আওয়ামী লীগ রাজধানীতে তো নয়ই, ঢাকার বাইরে গোপালগঞ্জেও কয়েকশো মানুষ জড়ো করতে পারেনি। অথচ সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলনামূলক দুর্বল—গত আগস্টের পর তারা আরও নিরুৎসাহিত। মাঠে সাধারণ মানুষের উপস্থিতিই এখন আসল শক্তি।

এই ব্যর্থতা দুটো বিষয় বুঝিয়ে দেয়—দলের প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতি নেই, আর নিজেদের কর্মীরাও মাঠে নামছে না। অনেক নেতা নেই, আর এই লড়াইকে অনেকের কাছেই মনে হচ্ছে ঝুঁকি নেওয়ার মতো জরুরি না । তাই সজীব ওয়াজেদ জয় যখন হুঁশিয়ারি দেন—নির্বাচনে বাধা দিলে নাকি সহিংসতা বাড়বে—তা খুব গুরুত্ব পাওয়ার মতো বলেই মনে হয় না।

দলের ভাঙন আরও স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায় শেখ হাসিনাকে এখন সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে হচ্ছে—কখনও ফোনে, কখনও ভিডিওতে। এ কাজ সাধারণত ওয়ার্ডের নেতাদের। তারা ইউনিয়ন, উপজেলা হয়ে উপরে খবর পাঠান। সেই পুরো সিঁড়িটাই যেন ভেঙে গেছে। হাসিনা এখন নিজেই সেই সিঁড়ি আবার গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।

তিনি একবার শূন্য থেকে দল গড়েছিলেন—নৌকায়, বাসে, পায়ে হেঁটে সারা দেশ ঘুরে। কিন্তু আজকের সময়টা আর ৮০–এর দশক নয়। তখন তিনি ছিলেন শহীদ নেতার কন্যা—মানুষের সমবেদনা তাকে ঘিরে ছিল। আজ তিনি বিদেশে, তার শীর্ষ সহকর্মীরাও দূরে। দলের কিছু পুরোনো নেতা প্রকাশ্যে বলছেন—যা হয়েছে, ভালোই হয়েছে। তারা নতুন রাজনীতির কথাও তুলছেন।

বাংলাদেশের মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী সমাজে আওয়ামী লীগের সমর্থক আছে—এটা সত্যি। তারা কথা বলতে পারে, কিছু প্রভাবও আছে। কিন্তু ভোটের মাঠে তাদের প্রভাব খুবই কম। তাদের বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষয়ে গেছে। এখন তারাও কথা শুরু করেন এই বলে—হাসিনার শাস্তি নাকি যথাযথ; তারপর যোগ করেন, দলটিকে তবু চলতে দেওয়া উচিত। অন্যদিকে ফেসবুক-ইউটিউবে দল-সমর্থকরা সক্রিয় হলেও তাদের কনটেন্টে রাগ, ব্যঙ্গ আর প্রতিশোধের ভাষা বেশি—এই ভাষায় মানুষের মন ফেরানো যায় না।

ভারতের সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশ নিয়ে অস্বাভাবিক আগ্রহ দেখাচ্ছে। তাদের প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতি স্পষ্ট। কিন্তু বাংলাদেশে সেই কণ্ঠস্বর সন্দেহের চোখে দেখা হয়। বাইরের এই পক্ষপাতমূলক সমর্থন উল্টো দলটির ক্ষতিই বাড়াতে পারে।

দলের একমাত্র স্থির ভরসা—বিদেশে থাকা সমর্থকরা। তারা এখনো দলকে ধরে রেখেছে। কিন্তু প্রবাসীদের আবেগ দিয়ে দেশের রাজনীতি চালানো যায় না।

সব মিলিয়ে সামনে পথ কঠিন। যদি আগামী নির্বাচনে বিএনপি–জামায়াত সত্যিকারের লড়াইয়ে নামে, আর মানুষ যদি বিশ্বাস করে—তাদের ভোট এবার গুণে দেখা হবে—তবে আওয়ামী লীগ আরও কোণঠাসা হয়ে পড়তে পারে।

এখন মনে হচ্ছে, দলটি এক অন্ধকার দশকের দিকে এগোচ্ছে—যদি না ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত নতুন করে সংগঠন গড়ে তুলতে পারে। আর যে আকারের পুনর্গঠন দরকার, দক্ষিণ এশিয়ায় তার উদাহরণ নেই। তার ওপর হাসিনার পাশে এখন যে ছোট, দুর্বল, বাস্তবতা–বিচ্ছিন্ন নেতৃত্ব আছে—তাদের ক্ষমতা কতটা, সেটাই বড় প্রশ্ন।

লেখক : রাজনৈতিক কর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *