মারুফ আহমেদ
রাতটা ছিল নিস্তব্ধ। সাতক্ষীরার সেই গ্রামে মাঝে মাঝে কুকুরের ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ ছিল না। ঘরের ভেতরে ২৩ বছরের রেজিয়া খাতুন তখন প্রসব যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। জাতীয় দলের জার্সি পরে যে মেয়ে দেশকে গর্বিত করেছে, সে নিজের ঘরেই জীবন-মৃত্যুর লড়াই করছিল। প্রসবের সময় হঠাৎ অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। ঘরে কোনো প্রশিক্ষিত ধাত্রী নেই। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেই জরুরি প্রসবসেবা। রাতের অন্ধকারে অ্যাম্বুলেন্সও পাওয়া গেল না। পরিবার ভ্যান খুঁজতে বের হলো, কিন্তু কেউ ধরতে রাজি নয়। রেজিয়ার শ্বাস তখন ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসছে।
স্বামী শুধু বলতে পেরেছিলেন—
“আগে হাসপাতালে নিতে পারলে বাঁচত।”
এই একটা বাক্যে বাংলাদেশের গ্রামীণ মাতৃস্বাস্থ্যের পুরো ব্যর্থতা দাঁড়িয়ে যায় সামনে।
সন্তানটি বেঁচে যায়। রেজিয়া বাঁচে না।
বাংলাদেশ নারী ফুটবলের সাফল্যের ঝলকানি যখন আলো ছড়ায়, আমরা প্রায়ই ভুলে যাই—এই মেয়েরা কোন বাস্তবতা থেকে উঠে আসে। রেজিয়া সাতক্ষীরার এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসেছিল। মাঠে ছিল দৃঢ়, দ্রুত, আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু মৃত্যুর রাতে তার পাশে ছিল না কোনো সক্ষম স্বাস্থ্যসেবা।
তার মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় কোনো তদন্ত হয়নি। কোনো জরিপ বা দায় নির্ধারণ হয়নি। মাতৃমৃত্যুর তালিকায় আরেকটি ‘ঘরে প্রসব’ যোগ হলো নিঃশব্দে—সবকিছুর মতো এটাও হারিয়ে গেল।
তবু রেজিয়ার গল্প এখানেই শেষ হওয়া উচিত নয়। কারণ তার মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য ছিল। সঠিক সময়ে চিকিৎসা পেলেই সে আজ বেঁচে থাকতে পারত।
ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ জয়ের পর ফুটবলারদের জন্য ঘোষণা এলো দুটি কোটি টাকা পুরস্কার। জাতী আনন্দে ভেসে গেল—এতে আপত্তি নেই।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়—যে দেশে কোটি টাকা পুরস্কার দিতে কোনো বাধা নেই, সে দেশ কি রেজিয়ার স্মরণে তার ইউনিয়নে মাত্র এক কোটি টাকার একটি EmOC ইউনিট চালু করতে পারে না?
একটি ইউনিয়নে কার্যকর EmOC ইউনিট চালু করতে ৫০–৭০ লাখ টাকার বেশি লাগে না। এক কোটি টাকা হলে ২৪ ঘণ্টা ধাত্রী, দক্ষ নার্স, রক্তের সুবিধা, জরুরি পরিবহন—সবকিছুই নিশ্চিত করা যায়।
এমন একটি ইউনিট থাকলে রেজিয়া আজ বেঁচে থাকতে পারত।
তার গ্রামে আজও— ঘরে প্রসবই স্বাভাবিক চিত্র। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জরুরি সেবা নেই। রাতে অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া কঠিন। জরুরি অবস্থায় ২০–৩০ কিলোমিটার দূরের হাসপাতালে যেতে হয়। অনেক নারী মাঝপথেই মারা যায়
রেজিয়ার পরিবারের মতো ভয় আজও গ্রামের বহু নারীর ভয়— “প্রসবের সময় যদি কিছু হয়, হাসপাতালে যাব কীভাবে?”
এ ভয় শুধু সাতক্ষীরার নয়—বাংলাদেশের শত শত ইউনিয়নের।
যদি ফুটবল কর্তৃপক্ষ বা সরকার সত্যিই রেজিয়াকে সম্মান জানাতে চায়, তাহলে মাত্র এক কোটি টাকায় তার ইউনিয়নে একটি পূর্ণাঙ্গ EmOC ইউনিট গড়ে তোলা সম্ভব। এতে থাকবে— ২৪/৭ প্রশিক্ষিত ধাত্রী। প্রয়োজনীয় রেফারাল–সিজারিয়ান ব্যবস্থা। রক্তের সহজলভ্যতা । রাতের জরুরি অ্যাম্বুলেন্স । গর্ভবতী নারীদের নিয়মিত চেক-আপ । নবজাতকের নিরাপদ সেবা ।
এটি হবে শুধু স্মরণ নয়—ভবিষ্যতের শত শত রেজিয়াকে বাঁচানোর পথ।
বাংলাদেশ মাতৃস্বাস্থ্যের সংকটে রয়েছে—এটা রেজিয়ার মৃত্যু চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের দেখায়।
ম্যাচজয়ের আনন্দ ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু সেই পুরস্কারের সামান্য অংশ যদি রেজিয়ার ইউনিয়নের নারীদের জীবন রক্ষা করে—
তাহলেই হবে তার প্রতি সত্যিকারের সম্মান।
প্রশ্নটা আমাদের— একটি EmOC ইউনিট স্থাপন, এক কোটি টাকার একটি ছোট বিনিয়োগ—এটা কি রেজিয়ার স্মৃতির জন্য খুব বেশি?
হয়তো না।
কিন্তু ফুটবলাররা চাইলে তবেই তা সম্ভব।