জাতীয় কবিতা পরিষদের নিয়মিত কবিতাপাঠ ও আলোচনা অনুষ্ঠানের ৫৪তম আয়োজন অনুষ্ঠিত হয় ১১ নভেম্বর, মঙ্গলবার বিকাল ৫টায় রাজধানীর ২৬ ইস্কাটন গার্ডেন রোডের কাজল মিলনায়তনে। সভাপতিত্ব করেন জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান। আলোচনার বিষয় ছিল— ‘মৈমনসিংহ গীতিকায় রাষ্ট্রসংঘের উপস্থিতি’।
সভায় আলোচক ড. আকিমুন রহমান মধ্যযুগের সাহিত্য থেকে মৈমনসিংহ গীতিকার সামাজিক বাস্তবতা খুঁজে বের করেন। তিনি বলেন, বাংলা সাহিত্যের যাত্রা শুরু হয়েছে আনুমানিক ৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে, এবং সেই দীর্ঘ পথে মধ্যযুগ—১২০১ থেকে ১৮০০—একটি বিশেষ সময়পর্ব। এ সময়ের অধিকাংশ রচনা দেব-দেবীর স্তুতিমূলক হলেও মৈমনসিংহ গীতিকার অবস্থান আলাদা। মধ্যযুগের শেষভাগে পূর্ব মৈমনসিংহ অঞ্চলে—বিশেষত নেত্রকোণা ও মুন্সিগঞ্জ এলাকায়—মুখে মুখে রচিত এই গীতিকাগুলো মূলত নারীর প্রেম, প্রেমের আত্মত্যাগ এবং প্রেমের টানে জীবনের বিসর্জনের অনন্য আখ্যান তুলে ধরে। তবে শুধু প্রেম নয়, এই গানে উঠে এসেছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দৈন্য, সামাজিক প্রতিপত্তিশালীদের হিংস্রতা, এবং সাধারণ মানুষের ওপর অব্যাহত নিষ্পেষণের চিত্র।
ড. রহমান বলেন, প্রেম-ভিত্তিক গল্পের আবরণে মৈমনসিংহ গীতিকায় লুকিয়ে আছে তীব্র সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত। ক্ষমতাসীনদের অন্যায় আচরণে অনেক মানুষ বিচার না পেয়ে নিগৃহীত হয়েছে, তাদের পরিবার ও সামাজিক অবস্থান ভেঙে পড়েছে, আর তারা কেউ কেউ মৃত্যুকেই আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করেছে। ফলে এই গীতিকা কেবল প্রেমকাহিনি নয়—এটি রাষ্ট্রীয় অনাচার, অত্যাচার ও শোষণের ভয়াল বাস্তবতার দলিল। এই কারণেই আঞ্চলিক সংঘাতের ভেতর রাষ্ট্রসংঘের উপস্থিতি আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই।
তিনি আরও জানান, তাঁর গবেষণার আগ্রহ বরাবরই মধ্যযুগে থাকলেও পিএইচডি’র সময় তাঁর তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ মধ্যযুগ নিয়ে কাজ পছন্দ করতেন না বলে তেমনভাবে এগোতে পারেননি। তবু মৈমনসিংহ গীতিকার সাহিত্যিক ও সামাজিক মূল্য তাঁকে বরাবরই টেনে রেখেছে। উল্লেখ্য, ১৯২৩ থেকে ১৯৩২ সালের মধ্যে দীনেশচন্দ্র সেন বিভিন্ন সূত্র থেকে গীতিকাগুলো সংগ্রহ ও সম্পাদনা করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করেন।
আলোচনায় জাতীয় কবিতা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সেমিনার বিষয়ক সম্পাদক কবি মঞ্জুরুর রহমান বলেন, পূর্ব বাংলার সাহিত্য আমাদের গর্বের জায়গা। আজকের আলোচনায় মৈমনসিংহ গীতিকার চারটি উপাখ্যান সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যার ভিতরে যুগের সামাজিক বাস্তবতা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন, মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য যেমন দেব-দেবীর স্তুতি দিয়ে গড়ে উঠেছিল, তেমনি শেষভাগে ভারতচন্দ্র রায়ের রচনায় আমরা প্রথম আত্মিকতার সন্ধান পাই—যেমন মায়ের আকুতি, “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।”
মঞ্জুরুর রহমান মনে করেন, দেব-দেবীর আখ্যান থেকে বের হয়ে পূর্ব বাংলার কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা ও মৈমনসিংহ অঞ্চলের মানুষের বাস্তব জীবন, প্রেম, সংগ্রাম, শোক ও প্রতিরোধ—সবই মৈমনসিংহ গীতিকায় মানবিক বয়ানে উঠে এসেছে। অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত এসব কাহিনীর আবেগমথিত গাঁথনি আলোচক ড. আকিমুন রহমান অত্যন্ত প্রাণবন্তভাবে উপস্থাপন করেছেন।
অনুষ্ঠানটি শেষ পর্যন্ত সাহিত্য, সমাজতত্ত্ব ও ইতিহাস—তিনের এক আকর্ষণীয় মিলনস্থলে পরিণত হয়। মৈমনসিংহ গীতিকার নতুন পাঠ ও নতুন ব্যাখ্যা তাই আরও বিস্তৃত আলোচনার পথ খুলে দেয়।