আধুনিক শিল্প কি আসলে আরও আগে শুরু হয়েছিল?

 

অনেকে বলেন, “আধুনিক শিল্প” শুরু হয়েছে ১৮০০–এর দশকে। কিন্তু কি তা সত্যি? প্রায় একশ বছর আগেই কি জোসেফ রাইট অব ডার্বির আঁকা An Experiment on a Bird in the Air Pump থেকে আধুনিকতার পথ শুরু হতে পারে?

“আধুনিক শিল্প” কী—এটা সহজ প্রশ্ন মনে হলেও সমালোচক ও শিল্প–ইতিহাসবিদেরা এ নিয়ে বহু বছর ধরে তর্ক করে চলেছেন। কোন শিল্পকর্ম দিয়ে “প্রচলিত” আর “আধুনিক”–এর সীমারেখা টানা হবে, তা নিয়েও একমত হওয়া যায়নি।

অনেকে ১৮০০–এর দশকের কয়েকটি চিত্রকর্মকে সেই সূচনা হিসেবে দেখেন—মানের Le Déjeuner sur l’Herbe (১৮৬৩), টার্নারের Rain, Steam, and Speed (১৮৪৪) এবং গয়ার The Third of May 1808 (১৮১৪)। সমালোচক রবার্ট হিউজ তো গয়াকে বলেছিলেন “প্রথম আধুনিক শিল্পী এবং শেষ পুরোনো মাস্টার”।

কিন্তু লন্ডনের ন্যাশনাল গ্যালারির নতুন প্রদর্শনী আমাদের সামনে আরেকটি দাবি তুলে ধরেছে। এমন এক ছবি, যেখানে আধুনিক শিল্পের অনেক উপাদানই আছে—এবং তা সময়ের অনেক আগেই—জোসেফ রাইটের An Experiment on a Bird in the Air Pump (১৭৬৮)।

বিজ্ঞান ও শিল্প—একই ধারার দুই মুখ

ছবিটিতে দেখা যায় এক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা। কাঁচের পাত্র থেকে অক্সিজেন বের করা হচ্ছে। পাত্রে রাখা সাদা ককাটু পাখিটি দমবন্ধ হয়ে রয়েছে। চারিদিক অন্ধকার। দর্শকেরা প্রাণ–হরণের সেই নাটক দেখছে অবাক হয়ে। রাইট এক ধরনের সঞ্চালনা তৈরি করেছেন—মাঝখানের ঘটনার ঢেউ চারপাশের মানুষের মুখে–মুখে ছড়িয়ে পড়েছে।

মাঝখানে বিজ্ঞানী। তার এক হাত কাচের পাত্রের ভাল্বে—যেখানে ইচ্ছা করলে সে বায়ু ঢুকতে বা বের হতে দিতে পারে। টেবিলে কাছে রাখা আছে এয়ার পাম্প। দর্শকেরা নানা ভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। বাঁ দিকে এক তরুণ–তরুণী পরীক্ষা বাদ দিয়ে একে–অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। ডান দিকে দুই কিশোরী ভয় পেয়ে গেছে নিষ্ঠুরতার দৃশ্য দেখে। সামনের পুরুষেরা যদিও নিজেদের সামলে রেখেছে। পেছনে এক ছেলে চাঁদের আলো ঢোকার পথ আটকাতে পর্দা নামাচ্ছে। ঘরের আরেকটি আলো এক লণ্ঠন থেকে আসছে, যার সামনে রাখা আছে মানুষের একটি খুলি।

তাহলে আধুনিকতার ছাপ কোথায়?

প্রথমত, রাইট পুরোনো শিল্পরীতিকে নতুনভাবে ব্যবহার করেছেন। পরিচিত ভঙ্গিমা ও আলোর ব্যবহার তিনি এনে ফেলেছেন এক সমসাময়িক ঘটনার মাঝে।

এটাই পরে চার্লস বোদলেয়ার আধুনিক চিত্রকলার মূল বৈশিষ্ট্য বলেছিলেন—সময়ের পরিবর্তনকে গ্রহণ করা, কিন্তু তাতে অতীতের দৃঢ় শিল্পরীতির ছাপ রাখা। মানে তার Le Déjeuner sur l’Herbe–এ যেমন করেছিলেন—আজকের দিনের পিকনিকের দৃশ্য, কিন্তু ভঙ্গি নেওয়া রাফায়েলের The Judgment of Paris–এর কাছ থেকে।

রাইট কিন্তু প্রায় এক শতাব্দী আগেই একই চেষ্টা করেছিলেন। তার ছবির তুলনা করা যায় কারাভাজ্জোর Supper at Emmaus–এর সঙ্গে। আলো–অন্ধকারের নাটকীয় ব্যবহারে রাইট ছিল অনন্য। কিউরেটর ক্রিস্টিন রাইডিং মনে করেন, লন্ডনের তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে রাইট নিজের আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছিলেন। আর সেই কারণে কেউ তার কাজ নকল করতে সাহস পায়নি।

যদিও এয়ার পাম্প তৈরি হয়েছিল আরও আগে, ১৬৫০ সালে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার যে প্রবণতা, তা ছিল আধুনিক মনোভাবের ইঙ্গিত।

সময়ের পরিবর্তনকে চিত্রে আনা

রাইটের ছবিতে আধুনিকতার দ্বিতীয় রূপ হলো সমাজের পরিবর্তনকে আঁকা। সাধারণত এই কৃতিত্ব দেওয়া হয় টার্নারের মতো শিল্পীদের। কিন্তু রাইটের সময়েই ব্রিটেনে নতুন প্রদর্শনীর সুযোগ তৈরি হয়েছিল। রয়্যাল অ্যাকাডেমী প্রতিষ্ঠার আগে শিল্পীরা নানা প্রদর্শনীতে অংশ নিতেন। An Experiment on a Bird in the Air Pump প্রথম দেখানো হয় Society of Artists of Great Britain–এ। এই প্রতিষ্ঠান শিল্প, বিজ্ঞান ও কারিগরি—সবকিছুকেই উৎসাহ দিত। তখনো এসব বিষয়ে আলাদা দেয়াল তোলা হয়নি।

এই সুযোগেই রাইট বিজ্ঞানকে শিল্পের বিষয় করলেন। সমাজে তখনই শুরু হয়েছে শিল্পবিপ্লবের সঞ্চারণ, বিশেষ করে তার জন্মস্থান মিডল্যান্ডসে। রাইট ঘনিষ্ঠ ছিলেন লুনার সোসাইটি–র সদস্য এবং শিল্পবিপ্লবের উদ্যোক্তা রিচার্ড আর্করাইটের মতো ব্যক্তিদের সঙ্গে।

তাই এই চিত্রে আছে আধুনিক চিন্তার ছাপ। সমালোচকেরাও তখন রাইটকে আলাদা দৃষ্টিতে দেখেছিলেন। Gazetteer পত্রিকা তাকে বলেছিল “অদ্ভুত জিনিয়াস”—যার অর্থ ছিল আসলে অসাধারণ।

তবে তার আঁকার ধরণ ছিল ১৭শ শতকের কারাভাজ্জোর মতোই। এটিই তাকে গয়া বা টার্নারের থেকে আলাদা করে। টার্নারের ছবিতে যেমন আলো, আন্দোলন, বাষ্প—সবকিছু এক নতুন কৌশলে ফুটে ওঠে।

আধুনিক শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য—বাস্তবতার বদলে প্রকাশভঙ্গির স্বাধীনতা—তা ১৯শ ও ২০শ শতকে আরও জোরালো হয় ক্লিন্ট বা কান্দিনস্কির মতো শিল্পীদের হাতে।

প্রশ্ন, সন্দেহ, দ্বিধা – রাইটের আধুনিকতা

ক্রিস্টিন রাইডিং মনে করেন, রাইটের সবচেয়ে আধুনিক দিক হলো তার প্রশ্ন তোলা ও সন্দিহান দৃষ্টিভঙ্গি।

An Experiment on a Bird in the Air Pump–এ কোনো সহজ নীতিকথা নেই। বিজ্ঞানীর হাত ভাল্বে থমকে আছে—চাইলে সে পাখিটিকে বাঁচাতে পারে, চাইলে মরতে দিতে পারে। তার অন্য হাত দর্শকের দিকে বাড়ানো—যেন আমাদেরই সিদ্ধান্ত জানতে চাইছে।

এই প্রশ্ন আজও আধুনিক—বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যে শক্তি দেয়, তা আমরা কীভাবে ব্যবহার করব? উপকারে, নাকি অপকারে?

গয়ার The Disasters of War–এ যে মানবিক অন্ধকার প্রথমবার স্পষ্টভাবে উঠে আসে, তার ইঙ্গিত রাইট আরও আগে দিয়ে ফেলেন। মেয়েটির ভয়ের চোখে, বা বৃদ্ধ মানুষের অস্থির ছায়ায়—সবকিছুতেই সেই সংশয় লুকিয়ে আছে।

তাহলে কি এটিই আধুনিক শিল্পের প্রথম ছবি?

উত্তর সহজ নয়। সামনে থেকে দেখে হয়তো মনে হবে—এটি ১৯শ বা ২০শ শতকের আধুনিকতার মতো নয়। কিন্তু আধুনিক বিশ্বের উদয়কে যে প্রথমবার শিল্পে ধরা হয়েছিল, সেটা ঠিকই বলা যায়।

প্রাচীন রীতি ব্যবহার করে তিনি আঁকলেন সমসাময়িক জীবন। সমাজের বড় পরিবর্তনকে সরাসরি যুক্ত করলেন শিল্পের সঙ্গে। আর মানব–অগ্রগতির মাঝেই রাখলেন এক অস্থির প্রশ্নবোধ।

রাইট পুরোপুরি পুরোনো ধারার নন, আবার পুরোপুরি আধুনিকও নন। তিনি সেই সীমান্ত–রেখায় দাঁড়িয়ে—শিল্প যেদিন tradition থেকে বেরিয়ে নতুন যুগে ঢুকতে শুরু করল।

সূত্র : বিবিসি কালচার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *