ধর্মেন্দ্র: তারকা, প্রেম, দ্বিধা আর বিস্ময়কর জীবনযাত্রা

 

বিজয় মজুমদার

বলিউডের শক্তিমান নায়ক বলতে আমরা যাঁকে এক নামে চিনে ফেলি, তাঁর আসল নাম কেবল কৃষ্ণ দেওল—যা অনেকেই জানেন না। তবে ‘ধর্মেন্দ্র’ নাম উচ্চারিত হলেই মনে পড়ে যায় বলিউডের হিম্যান, শক্তিশালী অ্যাকশন হিরো, রোমান্টিক নায়ক, আর পর্দায় অসংখ্য চরিত্রের এক অনন্য মিশেল।

১৯৩৫ সালে পাঞ্জাবের লুধিয়ানায় জন্ম নেওয়া ধর্মেন্দ্র ফিল্মফেয়ার পত্রিকার ট্যালেন্ট হান্ট প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে বম্বে শহরে আসেন—যা আজকের মুম্বাই। তখন তিনি বিবাহিত, এমনকি পুত্র সন্তানের জনক। পর্দায় শক্তিশালী নায়কের ইমেজ তৈরির আগেই তিনি রোমান্টিক হিরো হিসেবে পরিচিতি পান।

চলচ্চিত্রে প্রতিষ্ঠা পেতে তাঁকে যথেষ্ট স্ট্রাগল করতে হয়েছে। তাঁর প্রথম ছবি ‘দিল ভি তেরি হাম ভি তেরি’ মুক্তি পায় ১৯৬০ সালে—যেখানে তিনি সাইড–নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন। ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যর্থ ছিল। দ্বিতীয় ছবি ‘শোলা অর শবনম’ তাঁকে রোমান্টিক নায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তা এনে দেয়। তৃতীয় ছবি ‘বন্দিনী’–তে তিনি মূল চরিত্র না হলেও তাঁর অভিনয় অত্যন্ত প্রশংসিত হয়।

ধর্মেন্দ্রের প্রথম সুপারহিট আসে নেগেটিভ চরিত্রে—ছবির নাম ‘আয়ি মিলন কি বেলা’। তারপরও দীর্ঘ সময় তিনি রোমান্টিক নায়ক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। তবে যে চলচ্চিত্রটি তাঁকে ‘হিম্যান’ উপাধিতে ভূষিত করে, সেটি হলো অমর ক্লাসিক ‘শোলে’; যেখানে তাঁর শক্তিশালী পর্দা–উপস্থিতি তাঁকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

পর্দার নায়ক ধর্মেন্দ্র ব্যক্তিজীবনে ছিলেন বেশ আলোচিত। বিবাহিত হয়েও তিনি কয়েকজন নায়িকার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন—এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মীনা কুমারী ও হেমা মালিনী। সুন্দরী অভিনেত্রী হেমার বিয়ে তখন প্রায় জিতেন্দ্রর সঙ্গে ঠিক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। হেমাকে বিয়ে করতে ধর্মেন্দ্র ধর্ম পরিবর্তন করে ‘দিলওয়ার খান’ নাম গ্রহণ করেন। হেমা মালিনীর নাম হয় ‘আয়েশা বিবি’।

১৯৫৪ সালে ধর্মেন্দ্র প্রথম স্ত্রী প্রকাশ কউরকে বিয়ে করেন। অন্যদিকে হেমা মালিনী বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়াতে চাননি। কিন্তু একসঙ্গে কাজ করতে করতে দুজনের হৃদয় ধীরে ধীরে কাছাকাছি আসে। তখন বলিউডের কয়েকজন নায়ক হেমাকে পছন্দ করতেন। তাঁদের একজন জিতেন্দ্র। পারিবারিকভাবে তাঁদের বিয়েও প্রায় সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছিল। সেই মুহূর্তে জিতেন্দ্রর প্রেমিকা শোভাকে নিয়ে হাজির হন ধর্মেন্দ্র। জিতেন্দ্র ও শোভার সম্পর্ককে স্বীকৃতি দিয়ে নিজের পথ পরিষ্কার করেন তিনি।

তবু তাঁদের বিয়ে আরও একবার সঙ্কটে পড়ে। কারণ প্রথম স্ত্রী প্রকাশ কউর ডিভোর্স দিতে রাজি হননি। হিন্দু ধর্ম অনুসারে একজন পুরুষ একবারই বিয়ে করতে পারে। বাধ্য হয়ে ধর্মেন্দ্র ধর্ম পরিবর্তন করেন। নিকাহনামায় লেখা আছে—দিলওয়ার খান কেবল কৃষ্ণ দেওল ১,১১,০০০ টাকা মোহর দেনমোহরে আয়েশা বি আর চক্রবর্তীকে কবুল করছেন। দিনটি ছিল ২১ আগস্ট ১৯৭৯

দুটি পরিবার, ৩০০–এর বেশি চলচ্চিত্র, দুই পুত্র, চার কন্যা—সবকিছুর মাঝে ধর্মেন্দ্র ছিলেন একাধিক ভূমিকার মানুষ। অবশেষে এই অভিনেতা বিদায় নিলেন পৃথিবী থেকে, রেখে গেলেন এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়—যার ভাঁজে আছে তারকার উত্থান, প্রেমের আলো–ছায়া, এবং এক জীবনের বিস্ময়কর পথচলা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *