দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল থেকে উত্তরে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে গড়ে উঠেছে পাঞ্জু বুক সিটি—একটি সম্পূর্ণ বই কেন্দ্রিক শহর। ২০০৩ সালে যাত্রা শুরুর পর এটি আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রকাশনা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, এখানে মানুষের চেয়ে বইয়ের সংখ্যা বেশি।
শহরটিতে এখন রয়েছে ৯০০-র বেশি বই-সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান—প্রকাশনা সংস্থা, মুদ্রণ কারখানা, কাগজ সরবরাহকারী, ডিজাইন স্টুডিও থেকে শুরু করে অসংখ্য ছোট বইয়ের দোকান। একই এলাকায় পুরো প্রকাশনা প্রক্রিয়া হওয়ার কারণে এটি দক্ষিণ কোরিয়ার গর্বে পরিণত হয়েছে।
পাঞ্জুর নকশা এমনভাবে তৈরি যে এটি শুধু শিল্প-পার্ক নয়, বরং এখানে আসলে এক ধরণের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা নেয়া যায়। কাঁচঘেরা ভবন, খোলা সবুজ মাঠ, বই-ক্যাফে, নদীর ধার—সব মিলিয়ে বইপ্রেমীরা এখানে দিনভর সময় কাটাতে পারেন। পরিবার নিয়ে সপ্তাহান্তে ঘুরতে আসার জন্য জায়গাটি এখন খুব জনপ্রিয়।
এখানে নিয়মিত শিশুদের বই উৎসব, আর্ট প্রদর্শনী ও বুক কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়। এমনকি যারা বইয়ে খুব আগ্রহী নন, তাদের জন্যও রয়েছে আউটলেট মল এবং আরামদায়ক হাঁটার পথ।
১৯৯০-এর দশকে সিউলে ভাড়া বাড়তে থাকায় ছোট প্রকাশকেরা সমস্যায় পড়েন। তখন সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে পাঞ্জুতে তৈরি হয় বই-শহর। দেওয়া হয় ট্যাক্স ছাড়, কম দামে জমি ও উন্নত অবকাঠামো। ফলে অল্প সময়েই এখানে জড়ো হয় শত শত প্রতিষ্ঠান। ২০১৪ সালের মধ্যেই ব্যবসার পরিমাণ ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছুঁয়ে ফেলে।
পাঞ্জুতে কাজ করা সম্পাদক লি মি-কাং বলেন, “আমরা শুধু বই ছাপাই না, বইকে বাঁচিয়ে রাখার কাজও করি।”
তিনি আরও জানান, সপ্তাহান্তে তার মেয়ে প্রায়ই তার সঙ্গে আসে, আর এখানেই সে প্রথম বই পড়তে শেখে।
শুধু মুদ্রিত বই নয়, পাঞ্জু এখন এগোচ্ছে ই-বুক, অডিওবুক, ফ্যান-ফিকশনসহ ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির দিকে। ২০৩০ সালের মধ্যে আরও ৩০০ প্রতিষ্ঠান যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাঞ্জু দেখিয়ে দিয়েছে—বই শুধু সংস্কৃতি নয়, একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক খাতও হতে পারে। ঢাকার আশপাশে এমন একটি ‘বই-নগরী’ গড়ে তোলা অসম্ভব নয়। প্রয়োজন সরকারি সহায়তা, প্রকাশকদের অংশগ্রহণ আর পাঠকের আগ্রহ।
সিউলে গেলে কিম্পো বিমানবন্দর থেকে মাত্র ৪০ মিনিটের বাসযাত্রায় পৌঁছে যাবেন পাঞ্জুতে। রবিবার সকালে গেলে বিনামূল্যে বুক কনসার্ট পাওয়া যায়। দুপুরে কিমচি-র্যামেন আর বিকেলের নদীর ধারের সূর্যাস্ত—একদিনের জন্য ঘোরার মতো দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছে সেখানে।