দিনাজপুর সরকারি কলেজে বই হাতে নেওয়ার মুহূর্তটা ছিল উৎসবের মতো। চলতি বছরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পাঠ কার্যক্রমের সূচনা হলো এখানেই। সকালে কলেজের হলরুমে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিল শিক্ষার্থীরা। বই পেলেই মুখে যে উজ্জ্বল হাসি ফুটে ওঠে, সেটাই যেন পুরো আয়োজনের লক্ষ্যকে স্পষ্ট করে দেয়—যুব প্রজন্মকে পুনরায় বইয়ের প্রতি টেনে আনা।
শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেন শিক্ষক ও স্থানীয় কর্মকর্তারা। তাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের প্রতিনিধিরা। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তাঁরা বলেন, বইপড়া শুধু পরীক্ষার জন্য নয়; এটি চিন্তা-চেতনা বাড়ায়, মনকে খোলা রাখে এবং ভবিষ্যতের জন্য সুস্থ মানস গঠনে সাহায্য করে।
দিনাজপুর সরকারি কলেজের এক শিক্ষার্থী বলছিল, “ফোন আর ইন্টারনেটের ভিড়ে আমরা আসলে বই ধরতে ভুলে যাই। কিন্তু হাতে বই পেলে অন্যরকম লাগে। এই কর্মসূচি আমাদের আবার সেই আনন্দে ফেরায়।”
দিনাজপুরের পরই কার্যক্রম পৌঁছে যায় মুন্সীগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে। সেখানেও একই উচ্ছ্বাস। এরপর মুন্সীগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ ও রামপাল মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও বই পেয়েছে। প্রতিটি স্থানে শিক্ষার্থীদের ভিড় প্রমাণ করে—পাঠাভ্যাস এখনও হারিয়ে যায়নি।
গ্রন্থকেন্দ্রের একটি ছোট কাঠামো। লোকবল সীমিত। বাজেটও বড় নয়। তবুও তারা দেশজুড়ে বইভিত্তিক পাঠ কার্যক্রমকে ছড়িয়ে দিতে চায়। কর্মকর্তাদের ভাষায়, “যত বেশি স্কুল-কলেজকে যুক্ত করা যায়, ততই দেশে পাঠের পরিবেশ শক্ত হবে। তাই সীমাবদ্ধতার ভেতরেও চেষ্টা থামছে না।”
বই বিতরণের পর শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই পড়বে। পরে তারা বইকেন্দ্রিক পরীক্ষায় অংশ নেবে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে দেওয়া হবে পুরস্কার। এতে শুধু প্রতিযোগিতা নয়, একটি আনন্দময় শিক্ষাবৃত্ত তৈরি হচ্ছে—যেখানে পড়া পথ দেখায়, আর পুরস্কার অনুপ্রাণিত করে।
গত বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, যারা পাঠ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়, তারা নতুন বইয়ের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। শিক্ষকরা জানান, ক্লাসে আলোচনার সময় এসব শিক্ষার্থীরা আরও আত্মবিশ্বাসী থাকে।
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে পাঠ সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবনে কাজ করছে। তাদের প্রচেষ্টা সীমিত হলেও লক্ষ্য বড়—আগামী প্রজন্মকে বইমুখী করা। কর্মকর্তারা বলেন, “ডিজিটাল যুগে বইকে আবার নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। হাতে বই ধরলে যে এক ধরনের নির্ভরতা, শান্তি, মনোযোগ তৈরি হয়—সেটা তরুণদের বোঝাতে চাই।”
দিনাজপুরের অনুষ্ঠানে দেখা যায়—বই হাতে যারা বের হচ্ছিল, তারা অনেকেই বইয়ের প্রথম পাতাই উল্টে দেখছিল। তাদের মুখের হাসি দেখে বোঝা যায়, বই এখনও আমাদের টেনে নিতে পারে। অন্যদিকে মুন্সীগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে কয়েকজন শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা বই পড়া নিয়ে নিজেদের মধ্যে ছোট ছোট গ্রুপ তৈরি করবে, একসঙ্গে আলোচনা করবে।
দেশজুড়ে পাঠ-উদ্দীপনা ফেরাতে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের এই উদ্যোগ নতুন আশা জাগায়। একটি বই হয়তো পুরো ব্যবস্থাকে বদলে ফেলতে পারে না, কিন্তু প্রতিটি বই একজন পাঠককে একটু ভালো করে। আর সেই পাঠকই একদিন সমাজকে এগিয়ে নিতে পারে।
দিনাজপুর থেকে শুরু হওয়া এই পথচলা দেশের আরও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছাক—এটাই প্রত্যাশা।