সর্বজনীন শিশু-যত্ন কেন্দ্রে শিশুদের মানসিক ক্ষতির আশঙ্কা

সর্বজনীন শিশু-যত্ন কি সত্যিই সবার জন্য ভালো? এই প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এনেছে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে তারা জানিয়েছে—দীর্ঘ সময় শিশু-যত্ন কেন্দ্রে থাকা অনেক শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে যে ধরনের সর্বজনীন শিশু-যত্ন নীতি দ্রুত বিস্তার পাচ্ছে, তার কার্যকারিতা নিয়ে তারা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।

প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে কানাডার কুইবেক প্রদেশের উদাহরণ। সেখানে ১৯৯৭ সালে সর্বজনীন শিশু-যত্ন কর্মসূচি চালু হয়। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা যায়—এই কর্মসূচির আওতায় থাকা অনেক শিশুর মধ্যে উদ্বেগ, আক্রমণাত্মক আচরণ ও অতিসক্রিয়তা বেড়েছে। সমস্যাগুলো শুধু শৈশবে নয়, কিশোর বয়সেও দেখা গেছে। কিছু ক্ষেত্রে অপরাধপ্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (NICHD)-এর গবেষণায় দেখা যায়—যেসব শিশু সপ্তাহে ৩০ ঘণ্টার বেশি শিশু-যত্ন কেন্দ্রে থাকে, তাদের সামাজিক দক্ষতা কমে, আচরণগত সমস্যা বাড়ে এবং বড়দের সঙ্গে সম্পর্কেও দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এই প্রভাব শিশু কোন পরিবারে বড় হচ্ছে বা তার মা কতটা শিক্ষিত—এসব কিছুর ওপর নির্ভর করেনি।

গবেষকদের মতে, শিশু-যত্ন কেন্দ্রে দীর্ঘ সময় থাকা অনেক শিশুর শরীরে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসোল বেড়ে যায়। বাড়িতে থাকলে এই হরমোন স্থিতিশীল থাকে, কিন্তু কেন্দ্রভিত্তিক যত্নে গেলে তা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এতে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বিভিন্ন গবেষণার ফল নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, সব দেশের বাস্তবতা এক নয়, তাই প্রতিটি দেশে একই প্রভাব পড়বে—এমন ধারণা ঠিক নয়। যদিও দ্য ইকোনমিস্ট মনে করে, নীতি গ্রহণের আগে শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়াই সর্বোত্তম পদক্ষেপ।

বাংলাদেশে এখনও সর্বজনীন শিশু-যত্ন ব্যবস্থা নেই। তবে শহরাঞ্চলে বেসরকারি কেন্দ্র বাড়ছে। গবেষণার আলোকে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতে শিশু-যত্ন ব্যবস্থা তৈরি হলে মান, নিরাপত্তা, প্রশিক্ষিত সেবাকর্মী, শিশু-বান্ধব পরিবেশ এবং পিতামাতার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

মায়েদের কর্মজীবনে অংশগ্রহণ বাড়াতে শিশু-যত্ন সেবা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তা যেন শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক দক্ষতা এবং পারিবারিক বন্ধনের ক্ষতি না করে—এই সতর্কতা দিয়েছে দ্য ইকোনমিস্ট। তাই নীতিনির্ধারকদের উচিত অর্থনৈতিক দিকের পাশাপাশি শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *