উত্তর চীনের শহর ওর্দোস একসময় কয়লা সম্পদের উপর নির্ভর করে বেড়ে উঠেছিল। তবে সময় বদলেছে। এখন এই শহর চীনের সবুজ রূপান্তরের এক অপ্রত্যাশিত উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। কার্বন নয়, ভবিষ্যৎ গড়ছে সবুজ প্রযুক্তিকে ভিত্তি করে।
ওর্দোসে তৈরি হয়েছে বিস্তৃত শূন্য-কার্বন শিল্পপার্ক। এখানে সৌরপ্যানেল ও বায়ুতরবাইনের বিদ্যুতে চলে স্মার্ট গ্রিড। এই গ্রিড নতুন শক্তি সরঞ্জাম তৈরি করা কারখানাগুলোকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। হাইড্রোজেন সরঞ্জাম, ফটোভোলটাইক যন্ত্র, বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যাটারি—সবই তৈরি হচ্ছে সবুজ শক্তিতে। পার্কের ৯০ শতাংশ কার্যক্রমই সবুজ বিদ্যুতে চলে এবং ব্যবহারের জন্য বর্জ্য জল পুনর্ব্যবহার করা হয়।
ফলে অল্প সময়েই দেখা গেছে বড় পরিবর্তন। গত বছর শুধু নতুন শক্তি সরঞ্জাম উৎপাদনেই পার্কটির আউটপুট মূল্য দ্বিগুণের বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ বিলিয়ন ইউয়ান—প্রায় ২.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এই উদ্যোগ এসেছে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের নেতৃত্বে। তিনি সম্পদ-নির্ভর অঞ্চলগুলোকে নতুন উন্নয়ন মডেল গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। ২০২৩ সালে ইনার-মঙ্গোলিয়া সফরের সময় তিনি ঐতিহ্যবাহী জ্বালানি খাতকে আধুনিকায়ন এবং সবুজ শক্তি উন্নয়নের প্রতি জোর দেন।
ওর্দোসের প্রকল্পটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। চীন ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে জাতীয় স্তরের প্রায় ১০০টি শূন্য-কার্বন শিল্পপার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে। পাশাপাশি পুরনো শিল্পপার্কগুলোকে কম-কার্বন বা শূন্য-কার্বন কার্যক্রমে রূপান্তর করা হচ্ছে।
এ উদ্যোগের পেছনে আছে জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী গড় তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতা ছুঁয়েছে। প্রেসিডেন্ট সি বলেছেন, সবুজ রূপান্তর শুধু জলবায়ু সংকট মোকাবেলার উপায় নয়, বরং নতুন অর্থনৈতিক বিকাশের শক্তি।
২০২০ সালে জাতিসংঘে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চীন ২০৩০ সালের আগে কার্বন নিঃসরণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে এবং ২০৬০ সালের আগে কার্বন-নিরপেক্ষ হতে কাজ করছে। ইতোমধ্যে ব্যাপক নীতিমালা গ্রহণ করা হয়েছে। এর ফলও দেখা যাচ্ছে স্পষ্টভাবে—পরিষ্কার শক্তি ব্যবহার এবং সৌর প্যানেল, বায়ু টারবাইন ও বৈদ্যুতিক যানবাহন উৎপাদনে বিশ্বে এগিয়ে রয়েছে চীন। এখন চীনের রাস্তায় প্রতি ১০টি গাড়ির মধ্যে একটি বৈদ্যুতিক।
ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলোও বদলে যাচ্ছে। নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে সেগুলোকে আধুনিক, স্মার্ট ও পরিবেশবান্ধব করে তোলার কাজ চলছে। একই সাথে দেশজুড়ে চালানো হচ্ছে ব্যাপক বনায়ন কর্মসূচি। টানা ১৮ বছর ধরে বেইজিংয়ে বৃক্ষরোপণে অংশ নেওয়া সি চিন পিংয়ের তত্ত্বাবধানে চীনের বনভূমি এখন দেশের মোট ভূমির ২৫ শতাংশেরও বেশি। ২০০০ সাল থেকে সারা বিশ্বে নতুন যে সবুজ এলাকা তৈরি হয়েছে, তার এক-চতুর্থাংশ এসেছে চীন থেকে।
কয়লার শহর ওর্দোস এখন হয়ে উঠছে নতুন দৃষ্টান্ত—চীন কীভাবে সবুজ অর্থনীতি ও প্রযুক্তিকে সামনে রেখে আগামী দিনের উন্নয়ন পথ তৈরি করছে, তার একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ।