ঢাকা শহর কি অটোরিকশা চালকদের খেলার মাঠ

মারুফ আহমেদ

ঢাকা আজ শুধু যানজটের শহর নয়—এটি এক অদৃশ্য বিশৃঙ্খলার ঘূর্ণিপাক। আর এই বিশৃঙ্খলার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অটোরিকশা ও তাদের চালকরা। কয়েক সপ্তাহের পর্যবেক্ষণ, মাঠপর্যায়ের তথ্য, যাত্রী–পুলিশ–স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলার পর স্পষ্ট এক বাস্তবতা উঠে এসেছে: অটোরিকশা চালকদের আচরণ এখন নগরের সবচেয়ে বড় নাগরিক সংকটগুলোর একটি।

এটি কেবল নিয়ম অমান্য করা নয়; এটি শহরের প্রতিদিনের জীবনকে পঙ্গু করে দেওয়ার এক নিষ্ঠুর চক্র।

ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন যে দৃশ্য দেখা যায়—

  • রাস্তার লেন মেনে না চলা
  • হঠাৎ থেমে যাত্রী তোলা
  • যেকোনো জায়গায় গাড়ি ঘোরানো
  • রাস্তা পুরোপুরি আড়াআড়ি করে দাঁড়িয়ে যাওয়া

এগুলোর কোনোটাই দুর্ঘটনাজনিত নয়। এটি এক ধরনের বেপরোয়া মনোভাব, যেখানে চালক মনে করেন—রাস্তা তার, নিয়ম তার, শহরের মানুষের স্বস্তি তার কাছে অপ্রাসঙ্গিক।

বাস, প্রাইভেটকার, সিএনজি—সবাই কোনো না কোনোভাবে সড়কে চলাচলের নিয়ম মানে। অটোরিকশা চালকদের প্রায় সবাই যেন নিয়মকে উপহাস করে। চালকদের বিষয়ে প্রচলিত ধারণা হলো তারা “সিভিক সেন্স জানে না”। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেকেই নিয়ম জানেন— তবু মানতে চান না। দ্রুত যাত্রী নেওয়ার লোভ—যেখানেই যাত্রী দেখেন, সেখানেই দাঁড়ান। অতি-সুবিধাবাদী মানসিকতা—নিজের আরামের জন্য পুরো সড়ক থামিয়ে দিতে দ্বিধা নেই।

চালকদের বড় একটি অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে, কারণ তারা জানে তাদের কিছুই হবে না। রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও দৈনিক চাঁদা দেয়ার কারণে কোন শাস্তির ভয় নেই—।

অটোরিকশার হঠাৎ থামা এবং এলোমেলো দাঁড়ানো—জ্যামের সবচেয়ে বড় উৎস। ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা গতি অসম নিয়মে বাড়ায়–কমানো—যা লেন-ফ্লো ভেঙে দেয়।

গুলিস্তান, শাহবাগ, ফার্মগেট, মিরপুর ঘুরে দেখেছি—যেখানে জ্যাম আছে, সেখানে প্রায়ই দেখা গেছে একটি বা কয়েকটি অটোরিকশা পুরো প্রবাহ আটকে রেখেছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে একটি কঠিন সত্য: ঢাকা শহরের একটি বড় অংশের অটোরিকশা চলছে রাজনৈতিক নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতায়।

অটোরিকশা অনুমোদনবিহীন। বিভিন্ন জেলা থেকে এনে ঢাকায় চালানো হয়। চাঁদা বাণিজ্য এত শক্তিশালী যে পুলিশ–ট্রাফিক কর্তৃপক্ষও অনেক সময় এদের স্পর্শ করতে পারে না।

এ চক্রের ওপর নির্ভর করে যারা গাড়ি চালান, তারা জানেন— রাস্তায় যা-ই করুন, কারও কিছু বলার নেই।

তখন তারা দায়িত্ববোধ হারিয়ে ফেলে। শহরবাসীর কষ্ট তাদের কাছে বিষয় নয়; নিজেদের আয়ের জায়গাটা নিরাপদ থাকলেই হলো।

অনেক যাত্রী ক্ষোভ নিয়ে বলেন—এরা আচরণে যেন “শুয়োরের পাল”। এই তুলনা কঠোর, কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতা শুনলে বোঝা যায়—এ ক্ষোভের নেপথ্যে আছে অসহায়তা।

সিগন্যালে লাল বাতি জ্বলে আছে, কিন্তু অটোরিকশা চালক এগিয়ে গিয়ে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে পুরো জ্যাম তৈরি করলেন। বাম লেনে দাঁড়িয়ে ডানে ঘোরার চেষ্টা। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভাড়া ঠিক করা—যাত্রী নামানো। ফুটপাত থেকে নামার মুখ দখল করে সারি করে রিকশা দাড় করিয়ে রাখা।

এগুলো কোনো দুর্ঘটনা নয়—এটি শহরের নিয়মের প্রতি  অবজ্ঞা।

যাত্রার সময় আরও ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। তাদের চাওয়া ভাড়াতেই যেতে হবে। অন্য গাড়ি যাত্রীর বলা ভাড়ায় যেতে চাইলে, বাকীরা তাকে গালাগালি করেন, কেউ কেউ মারতেও উদ্যত হন।

এমন প্রবণতা বোঝায়—চালকদের একটি অংশ নিজেদের শহরের “অদৃশ্য মালিক” ভাবতে শুরু করেছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, যদি এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়— ঢাকার রাস্তা আরও অনিরাপদ হবে।

তাদের মতে এখুনি যা করার প্রয়োজন:

জরুরি অভিযান: অনুমতিহীন সব অটোরিকশা প্রত্যাহার । রুট ও স্ট্যান্ড নির্ধারণ। চালকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক চক্র ভেঙে দেওয়া। অতিরিক্ত গাড়ি রাস্তায় নামলে কঠোর দণ্ড।

অটোরিকশা একটি দরকারি যান। কিন্তু চালকদের আচরণ আজ এটিকে শহরের “অরাজকতার প্রতীক” বানিয়েছে।

ঢাকার মানুষ ক্লান্ত—আর সহ্য করতে পারছে না। এই শহরকে স্বস্তি ফেরাতে হলে প্রথম কাজ হলো— অটোরিকশা চালকদের লাগাম টেনে ধরা।

শহর কারও ব্যক্তিগত খেলার মাঠ নয়—এটি কোটি মানুষের জীবনের গতি। এ গতি যে এখন থেমে যাচ্ছে—সেটার এক প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অটোরিকশা চালকদের বেপরোয়া দৌরাত্ম্য।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *