ইউরোপে রুশ পর্যটকদের ওপর কড়াকড়ি: নতুন ভিসা নীতি কী বার্তা দিচ্ছে ?

প্রায় চার বছর ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবার সরাসরি রুশ পর্যটকদের লক্ষ্য করে কঠোর পদক্ষেপ নিল। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ইইউ রুশ নাগরিকদের জন্য একাধিক প্রবেশাধিকারসম্পন্ন ভিসা (মাল্টিপল-এন্ট্রি ভিসা) বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে, প্রতিবার ইউরোপ ভ্রমণের আগে আলাদা করে নতুন ভিসার আবেদন করতে হবে রুশ নাগরিকদের। ইউরোপীয় কমিশনের বক্তব্য, এই সিদ্ধান্ত নিরাপত্তা ও নজরদারি বাড়াতে সহায়তা করবে ।

ইইউ-এর এই নতুন নীতির পেছনে বড় কারণ—রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপজুড়ে সাইবার হামলা, অগ্নিসংযোগ ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ। লাতভিয়ার মতো দেশগুলো সরাসরি অভিযোগ করেছে যে, রুশ গুপ্তচররা মাল্টিপল ভিসার আড়ালে ইউরোপে প্রবেশ করছে। ফলে, সাধারণ রুশ নাগরিকদের ভিসা প্রক্রিয়াকে আরও কঠোর করে তোলা হয়েছে ।

তবে এই কড়াকড়ির প্রভাব পড়ছে সাধারণ রুশ নাগরিকদের ওপর। যারা পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে, পড়াশোনা করতে বা ছুটি কাটাতে ইউরোপ যেতেন, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি বিপাকে। অনেক তরুণ, শিক্ষার্থী ও পেনশনভোগী এখন ইউরোপ যেতে পারছেন না। অন্যদিকে, রুশ ধনকুবেররা এখনও “গোল্ডেন ভিসা” বা “গোল্ডেন পাসপোর্ট”–এর মাধ্যমে ইউরোপে প্রবেশ করছেন। মাল্টা, পর্তুগাল বা ব্রিটেনে বিনিয়োগের বিনিময়ে নাগরিকত্ব বা বাসস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন তারা ।

রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেছেন, ইউরোপ এখন “অবৈধ অভিবাসীদের” প্রাধান্য দিচ্ছে, আর সাধারণ রুশ পর্যটকদের অপমান করছে। টেলিগ্রামে তিনি লেখেন, “মিলানে শপিং বা এইফেল টাওয়ার দেখতে যাওয়া আইনমানা পর্যটকদের চেয়ে অবৈধ অভিবাসীদের প্রতি ইইউ-এর আনুকূল্য বেশি” ।

মানবাধিকার সংগঠন ও রুশ নাগরিকদের একটি বড় অংশের দাবি, এই নীতি ভুল মানুষকে শাস্তি দিচ্ছে। যারা ক্রেমলিনের নীতির বিরোধী, যারা ইউরোপে পালিয়ে এসেছেন বা ইউরোপীয় মূল্যবোধে বিশ্বাস করেন—তারাই এখন আটকা পড়ছেন। অনেকের আশঙ্কা, এই বিচ্ছিন্নতা রুশ সমাজকে আরও অন্তর্মুখী করে তুলবে, যা ক্রেমলিনের প্রচারণাকে আরও জোরদার করবে ।

ইউরোপের এই নীতি কতদিন চলবে, তা নির্ভর করছে রাশিয়ার সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ভিসা নীতি যদি আরও কঠোর হয়, তাহলে রুশ পর্যটকরা হয়তো তুরস্ক, চীন বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর দিকে ঝুঁকবেন। ইউরোপের সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও মানবিক সম্পর্কও ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে ।

ইউরোপের নতুন ভিসা নীতি নিঃসন্দেহে একটি কৌশলগত বার্তা—রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ। কিন্তু এই পদক্ষেপ যে শুধুমাত্র ‘শাস্তি’ দিচ্ছে, তা নয়; এটি বিভাজনও তৈরি করছে—সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রক্ষমতার। প্রশ্ন হলো, এই বিভাজন ভবিষ্যতে ইউরোপ-রাশিয়া সম্পর্ককে আরও গভীর খাদে নিয়ে যাবে না তো?

 

সূত্র: The Economist

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *