প্রথম পর্ব
১৯৭১ সাল। এপ্রিলের এক বিকেল। সূর্য অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেন বিদায়ের মঞ্চ তৈরি করছে। সেই বিকেলের মতোই মধ্যবয়স থেকে প্রবীণতার দিকে এগিয়ে যাওয়া একজন স্কুলশিক্ষক ক্লান্ত শরীরে ফিরছেন তাঁর গ্রাম জগতপুরে। জগতপুর—ফেনী জেলার এখনকার ফুলগাজী, তখনকার ছাগলনাইয়া থানার একটি পরিচিত গ্রাম।
সেদিন তিনি ফিরছিলেন কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রামের বেতিয়ারা নামের গ্রাম থেকে। পরিচিত পথ নয়; একটু ভিন্ন পথ ধরে ফিরে আসছিলেন তিনি—ভারত সীমান্তের ভেতর দিয়ে। কারণ চিরচেনা সড়কে তখন চলছে গোলাগুলি। বিশেষ পরিস্থিতিতে ভারত সরকার যে হাঁটা পথটি খুলে দিয়েছিল, সেটিই ছিল তুলনামূলক নিরাপদ, কিন্তু কষ্টে ভরা।
এপ্রিলের ১০ তারিখ। সারাদিন উঁচু পাহাড় পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তাঁর পা ভেঙে আসছিল। শরীর অবসন্ন, মন বিষণ্ণ। বিষণ্ণতার মূল কারণ—তাঁর সদ্য বিবাহিত মেজ মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে রেখে আসতে হয়েছে। মেয়েটি বাবার সঙ্গে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু নিরাপদ পথটি হাঁটা পথ হওয়ায় তাঁকে সঙ্গে আনা সম্ভব হয়নি।
ঠিক এমন ক্লান্ত গোধূলির আলোয় তিনি দেখলেন, একদল তরুণ তাঁকে অতিক্রম করে ভারতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আচমকা সেই দলে এক বিস্ময় আবিষ্কার করলেন তিনি—কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটছে তাঁর ছোট ছেলে।
পিতাকে দেখেই ছেলেটির থমকে দাঁড়ানো।
ছেলের সংক্ষিপ্ত ঘোষণা, “যুদ্ধে যাচ্ছি। দোয়া করবেন।”
পিতার উত্তর, “বিজয়ী হয়ে ঘরে ফিরো।”
এইটুকুই বলে সেই প্রবীণ শিক্ষক আবার সামনে হাঁটা শুরু করলেন। পেছনে তাকানোর সাহস করলেন না। কারণ মনে ভয়—একবার চোখ ফিরিয়ে বলেই ফেলতে পারেন, “চল বাড়ি ফিরে যাই!” আর যদি তিনি এতটুকু বলেন, ছেলেটি হয়তো ফিরে আসবে।
তিনি জানতেন না, সামনের দিকে মুখ করে হাঁটতে থাকা তাঁর পিতার চোখ দিয়ে তখন নীরবে ঝরছিল অশ্রু। তিনি সেটি মুছতেও পারছিলেন না। যদি পুত্র দেখে ফেলে, তবে তার মন দুর্বল হয়ে পড়বে।
তিনি কাঁদতে কাঁদতেই হেঁটে চললেন। কারণ তিনি জানতেন—দেশ স্বাধীন না হলে, তাঁর এই পুত্র আর কোনোদিন ঘরে ফিরতে পারবে না।
আর হয়তো এই-ই তাঁদের শেষ দেখা।
সেই প্রবীণ শিক্ষকের নাম হাসমত উল্লাহ মজুমদার—বসন্তপুর হাইস্কুলের হেডমাস্টার। তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র জি. কে. এম.—গোলাম কাদের মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ মজুমদার, ডাকনাম শহীদ।
পরে ফেনীর পরশুরাম এলাকা হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম রণক্ষেত্র—যেখানে এই তরুণ শহীদও যুদ্ধ করেছেন।