HSBC এবং সুইডেন দূতাবাস মিলিতভাবে আয়োজন করেছিল এক ভিন্নধর্মী অনুষ্ঠান। উদ্দেশ্য—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নোবেল পুরস্কার প্রদানের ১১২ বছর পূর্তি স্মরণ করা। ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী এই বাঙালি ছিলেন প্রথম অ-ইউরোপীয় সাহিত্যিক, যিনি পশ্চিমা দুনিয়াকে বিমোহিত করেছিলেন নিজের কবিতা, গান ও মানবতাবাদী ভাবনায়।
অনুষ্ঠানটি ছিল গভীর আবেগে ভরা। HSBC–র প্রতিনিধিরা বলছিলেন—বাংলাদেশ ও বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের অবদান অতুলনীয়। সুইডেন দূতাবাসের কর্মকর্তারা স্মরণ করিয়ে দিলেন, নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথের নাম শুধু একটি অর্জন নয়; এটি দুই বিশ্বের সংযোগের এক অনন্য সেতুবন্ধন।
রবীন্দ্রনাথের নোবেল পাওয়া কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলি নিয়ে অনুষ্ঠানে আলোচনা চলল অনেকক্ষণ। বলা হলো—এই কবিতাগুলো শুধু সাহিত্য নয়; এগুলো মানুষের অন্তর্গত ভয়, সন্দেহ, ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের গভীর উপলব্ধিকে ছুঁয়ে যায়। আজও পৃথিবীর নানা দেশে তাঁর কবিতা পড়া হয়, গান গাওয়া হয়, নাটক মঞ্চস্থ হয়। যেন সময়কে পেরিয়ে তাঁর শব্দরাশি মানুষের ভেতরের আলোকে জাগিয়ে রাখে।
উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই বলছিলেন—রবীন্দ্রনাথকে উপলব্ধি করা মানে শুধু একজন সাহিত্যিককে জানা নয়। তাঁকে জানার মানে একটি মানবতাবাদী দর্শনকে আলিঙ্গন করা, যা মানুষকে বিভাজন নয়; বরং মিলনের পথে নিয়ে যায়। তাঁর সৃষ্টির ভেতর যে মুক্তচিন্তা, প্রকৃতিপ্রেম, মানুষের প্রতি গভীর সহমর্মিতা—এসবই আজকের পৃথিবীতে আরও বেশি প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে শিল্পী ও শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় পরিবেশিত হলো রবীন্দ্রসঙ্গীত আর কবিতা। প্রতিটি সুরে, প্রতিটি চরণে উঠে এলো সেই চিরচেনা বাঙালি অনুভব—নরম, মানবিক, সভ্যতার দিকে ডাক দেওয়া এক অভিব্যক্তি। এরপর আলোচনায় উঠে এলো রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলার কথা। তাঁর ছবি আজ বিশ্বের বিভিন্ন জাদুঘরে জায়গা করে নিয়েছে। কবিতা, সংগীত, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, চিত্রকলা—একজন মানুষ কীভাবে এতগুলো ক্ষেত্রে নিজেকে বিস্তার করতে পারেন, তা ভেবে অনেকেই মুগ্ধ না হয়ে পারেননি।
HSBC-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়—বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে ব্যাংকটির দীর্ঘ সম্পর্ক আছে। সেই ধারাবাহিকতায় তারা চাইছে এমন উদ্যোগ আরও বাড়াতে। অন্যদিকে সুইডেন দূতাবাস বলল—সুইডেনে এখনো রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে গবেষণা, পাঠচক্র ও সাংস্কৃতিক আলোচনা হয়। তাঁর অনুবাদকরা বলছেন, রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ ও বিশ্বনাগরিক দৃষ্টিভঙ্গি নতুন প্রজন্মের মধ্যেও গভীর আগ্রহ জাগায়।
অনুষ্ঠানের অতিথিরা একমত হন—রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করা মানে অতীতকে স্মরণ করা নয়; বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি মূল্যবোধকে ধরে রাখা। সৃজনশীলতা, মানবতা, ভিন্নতাকে গ্রহণ করার শক্তি—সবই তাঁর কাজের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। তাই তাঁর নোবেল জয় কেবল একটি পুরস্কার নয়; এটি আমাদের সভ্যতার এক স্থায়ী আলো।
ঢাকার এই স্মরণোৎসব সেই আলোকেই আবার নতুন করে জ্বালিয়ে দিল—নিরিবিলি, শৈল্পিক, চিন্তা-জাগানো উজ্জ্বলতায়।