গ্লোবাল সোর্সিং এক্সপো: রপ্তানি সম্ভাবনার এক নতুন দরজা

 

পূর্বাচলের চায়না–বাংলাদেশ এক্সিবিশন সেন্টারে ১ ডিসেম্বর সোমবার, সকাল থেকেই এক আলাদা উত্তেজনা ছিল। প্রবেশমুখে বিদেশি বায়ারদের সারি, সেক্টরভিত্তিক স্টলগুলোর আলো–আঁধারি, আর তরুণ উদ্যোক্তাদের ব্যস্ত দৌড়ঝাঁপ—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনার এক নতুন জানালা খুলে যাচ্ছে। এই পরিবেশেই শুরু হল রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) আয়োজিত Global Sourcing Expo–2025

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাট, এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা এস. কে. বশির উদ্দিন। তাঁর বক্তব্যে ছিল আশাবাদের সুর। তিনি বললেন, বাংলাদেশের রপ্তানি এখন আর শুধু পোশাকনির্ভর নয়। বহুমুখীকরণের নীতিকে সামনে রেখে নতুন নতুন সেক্টরে প্রবেশ এখন সময়ের দাবি।

প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী অনুষ্ঠানে বিশেষ  অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর সাথে ছিলেন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএবি)-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এবং এফবিসিসিআই প্রশাসক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রপ্তানি) আব্দুর রহিম খান

স্বাগত বক্তব্য দেন ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ হাসান আরিফ। পুরো অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান

এই এক্সপোতে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে এসএমই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে অংশ নেওয়া ৮ জন উদ্যোক্তা। পাটজাত পণ্য থেকে শুরু করে কৃষিপ্রক্রিয়াজাত খাবার, হস্তশিল্প থেকে চামড়াজাত পণ্য—বৈচিত্র্যে ভরা ছিল তাঁদের স্টলগুলো। এক উদ্যোক্তা বললেন, “এ ধরনের এক্সপো আমাদের জন্য বড় সুযোগ। সরাসরি বিদেশি বায়ারের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ খুব কমই আসে।”

এসএমই ফাউন্ডেশন জানায়, আগামী কয়েক বছরে কৃষি–ভিত্তিক ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার বাড়তে পারে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতেই তাঁদের এই অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান রপ্তানির বড় অংশই তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনীতির ওঠানামা, নতুন বাণিজ্যনীতির চাপ এবং প্রতিযোগিতার কারণে সরকার ও ব্যবসায়ীরা এখন বহুমুখীকরণের দিকে জোর দিচ্ছেন।

এই এক্সপোতে তাই পোশাকের পাশাপাশি দেখা গেল—

  • পাট ও পরিবেশবান্ধব পণ্য
  • প্লাস্টিক ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টর
  • চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য
  • কৃষি ও কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য
  • হস্তশিল্প ও ডিজাইন–বেইজড পণ্য

বিদেশি বায়ারদের আগ্রহও ছিল চোখে পড়ার মতো। ভারতের কয়েকটি রিটেইল চেইন, ইউরোপের দু–একটি সুপারমার্কেট সরাসরি বাল্ক অর্ডার নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। ইপিবির কর্মকর্তারা বলেন, ২০২৫ সালের বাকি সময়টা এবং ২০২৬ সালকে সামনে রেখে ব্যবসায়িক আস্থা বাড়াতে এই এক্সপো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রথম দিনের দুপুরে দেখা যায়, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া ও তুরস্ক থেকে আগত কয়েকটি বায়ার দল স্টল ঘুরে ঘুরে পণ্যের স্যাম্পল সংগ্রহ করছে। অনেকেই উদ্যোক্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় বসেন।

এক তরুণ পাট উদ্যোক্তার মুখে উচ্ছ্বাস—“বিদেশি বায়ারের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেছি আগে, কিন্তু আজ সরাসরি প্রোডাক্ট দেখাতে পারলাম। যদি অর্ডারটা হয়, তাহলে ব্যবসায় নতুন অধ্যায় শুরু হবে।”

Global Sourcing Expo–2025 শুধুমাত্র নতুন পণ্যের প্রদর্শনী নয়; বরং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার একটি কৌশলগত আয়োজন। ইপিবি জানায়, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখতে এ ধরনের এক্সপো আরও বাড়ানো হবে।

এ ছাড়া বিভিন্ন সেমিনার ও ম্যাচমেকিং সেশনও থাকবে, যেখানে বিশেষজ্ঞরা বলবেন—

  • কোন পণ্য কোন অঞ্চলে বেশি সম্ভাবনাময়
  • আন্তর্জাতিক বায়ারদের চাহিদা কী
  • রপ্তানি করতে কোন কাগজপত্র ও মান নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে
  • ব্র্যান্ডিং কীভাবে করলে বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে

১–৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা—এই তিন দিন আসলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য পরীক্ষার তিন দিন। উদ্যোক্তাদের মুখে আশা, সরকারি সংস্থাগুলোর সহায়তা, আর বৈশ্বিক বাজারের নতুন দরজা—সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্লোবাল সোর্সিং এক্সপো শুধু একটি প্রদর্শনী নয়; এটা বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির ভবিষ্যতের এক প্রতিশ্রুতিময় যাত্রা।

এ আয়োজন যদি ধারাবাহিকভাবে হয়, তাহলে আগামী দশকে বাংলাদেশ পোশাকের বাইরে আরও কয়েকটি সেক্টরে বিশ্বমানের খেলোয়াড় হয়ে উঠতে পারে—এই বিশ্বাসই বাড়ছে উদ্যোক্তাদের মাঝে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *