রাজীব আহমদ
বাংলাদেশের সরকারি কর্মচারীদের আচরণ নিয়ে সমাজে নানা ধরণের প্রশ্ন বহুদিনের। তাঁদের একটি বড় অংশকে নৈতিকভাবে দুর্বল বলে বিবেচনা করা হয়—শক্তের মুখে অনুগত, দুর্বলের প্রতি কঠোর। চাকরি রক্ষাই তাঁদের প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার। এর বাইরে কোনও নৈতিক দৃঢ়তা বা পেশাগত সাহস খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা যায় (বিরল ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে)।
চাকরিবিধি অনুযায়ী কর্মবিরতি অবৈধ হওয়া সত্ত্বেও, শুধু হুমকি পেলেই আন্দোলন থেমে যাওয়া—এটিই বরং সবচেয়ে বড় প্রমাণ। সামান্য সতর্কবার্তায়ই যেমন প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকরা আন্দোলন স্থগিত করেছেন; মাত্র ৪২ জনকে বদলি করতেই তাদের অবস্থান নরম হয়েছে।
ইউনূস সরকারের সময়ে গত ১৬ মাসে সরকারি কর্মচারীরা শত শত আন্দোলন করেছে। রাষ্ট্রের অর্থনীতি সংকটে থাকা অবস্থায় পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনী ছাড়া প্রায় সব ক্ষেত্রেই পদোন্নতি, বেতন–ভাতা ও সুবিধা বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন হয়েছে। একমাত্র পুলিশ বিভাগ পেশাগত দক্ষতা বাড়ানো এবং প্রভাবমুক্ত পরিবেশে কাজ করার দাবি তুলেছে—যা অন্তত কাজের মান উন্নয়নের দিকে নির্দেশ করে।
সবচেয়ে বেশি আন্দোলন হয়েছে শিক্ষা খাতে। কিন্তু লক্ষণীয়, কোনও শিক্ষক সংগঠনই শিক্ষার মানোন্নয়ন বা নিজস্ব দক্ষতা বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করেনি। প্রধান দাবি ছিল—চাকরির গ্রেড বাড়ানো, “অফিসার” মর্যাদা দেওয়া, সরকারি চাকরির আওতায় আনা, প্রয়োজন না থাকলেও নতুন প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করা এবং নিম্নমানের কলেজ—even যেগুলোতে ছাত্র নেই—সেগুলোকেও বেতন কাঠামোয় যুক্ত করা।
বেসরকারি খাতের পরিস্থিতিও যুক্ত করা হলো। অথচ চাকরিবিধি অনুযায়ী সরকারি স্কুল–কলেজের শিক্ষকরা কর্মবিরতি করার অধিকার রাখেন না। তবুও ইউনূস সরকারকে দুর্বল ভেবে আন্দোলন হয়েছে; বাচ্চাদের বার্ষিক পরীক্ষাকে জিম্মি করে কর্মসূচি চলেছে। কিন্তু সরকার কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিতেই আন্দোলন মুহূর্তে শেষ—এ থেকেই বোঝা যায় তাঁদের নৈতিক সাহসের অবস্থান কোথায়।
যদি ইউনূস সরকার সত্যিই ভবিষ্যতের সরকারকে একটি স্থিতিশীল প্রশাসন উপহার দিতে চাইত, তবে আন্দোলনের আহ্বানদাতাদের বিরুদ্ধে চাকরিবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল—যাতে নজির তৈরি হয়, যেমনটি হয়েছিল এনবিআরের ক্ষেত্রে। তখন এনবিআরের ক্যাডার সার্ভিস কর্মবিরতি করে পুরো দেশের রাজস্ব সংগ্রহ আটকে দিয়েছিল—যা রাষ্ট্রের অস্তিত্বকেই ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারত। দুর্নীতি দমন কমিশন আন্দোলনের নেতাদের সম্পদের হিসাব চাওয়ার পরপরই আন্দোলন থেমে যায়। পরে অনেকেই চাকরি হারান বা বাধ্যতামূলক অবসরে যান। এরপর কেউ আর টু শব্দও করেনি।
অন্যান্য ক্যাডার সার্ভিসের ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা নেওয়া হলে রাষ্ট্রযন্ত্র আজ ভিন্নরূপে দাঁড়াত। সম্প্রতি সংবাদে দেখা গেছে, ঢাকা সাত কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হলে শিক্ষা ক্যাডার সারা দেশে কর্মবিরতিতে যাবে। তাঁদের দাবি—এই কলেজগুলোতে শিক্ষা ক্যাডারদেরই শিক্ষক হিসেবে রাখতে হবে; যেন প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি।
কিন্তু সত্য সহজ—সরকারি চাকরিতে যোগ দিলে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে বদলি হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে। পছন্দ–অপছন্দের সুযোগ নেই।
নির্বাচনের সময়ে প্রিজাইডিং বা পোলিং অফিসার হয়ে কর্তব্য পালন না করে ভোট জালিয়াতি ঘটানোর পরও তাঁরা বলেন—“হুকুমের গুলাম”। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটলেও তাঁরা জনতার পাশে দাঁড়াননি; বরং ৪ আগস্ট সরকারের পক্ষে মিছিল করেছেন—যা চাকরিবিধি লঙ্ঘন। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর সুবিধা, পদোন্নতি ও আর্থিক প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোনও দ্বিধা ছিল না।
ইউনূস সরকারের এই ব্যর্থতার বোঝা পরবর্তী সরকারকেও বইতে হবে। আগের নির্বাচনে জড়িতদের জবাবদিহির ব্যবস্থা না হওয়ার কারণে আগামী নির্বাচনও কঠিন হয়ে উঠবে। যাদের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা বেশি—কর্মচারীরা তাঁদের দিকেই ঝুঁকবে। আর প্রশাসনে যে বিশৃঙ্খলা রেখে যাওয়া হলো, তা কীভাবে কাটানো যাবে—তা বলা কঠিন।