এক তরুণ মুক্তিযোদ্ধার সাহস, সংগ্রাম ও গোপন জীবন

বিজয় মজুমদার

দ্বিতীয় পর্ব

মুক্তিযোদ্ধা শহীদউল্লাহ মজুমদারের জন্ম ১৯৫৫ সালের ২৮ এপ্রিল, ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার জগতপুর গ্রামে। তিন ভাই ও চার বোনের বড় সংসারে তিনি ভাইবোনদের মধ্যে সবার ছোট। মায়ের স্নেহের সন্তান হলেও পিতা—বসন্তপুর হাইস্কুলের হেডমাস্টার হাসমত উল্লাহ মজুমদারের কঠোর শাসন ছিল অব্যাহতি-হীন। শান্তশিষ্ট ছিলেন না মোটেও; দুষ্টামির কারণে বাবার শাসনের পর মায়ের মারও জুটত, কারণ মায়ের কষ্ট ছিল—ছেলে কেন দুষ্টামি করে বারবার বাবার হাতে মার খায়।

প্রাইমারি স্কুল পাশ করার পর তাঁর পিতা সিদ্ধান্ত নিলেন ছেলেকে মাদ্রাসায় দেবেন। সেই অনুযায়ী তাঁকে ভর্তি করানো হলো ফেনীর মুন্সীরহাটের এক মাদ্রাসায়। কোরানে হাফেজ হয়ে মাদ্রাসার পড়া শেষ করলে হয়তো ভবিষ্যতে কোনো এক মসজিদের ইমাম হতেন—এমনটাই ছিল পরিবারগত প্রত্যাশা। কিন্তু একদিন এক ঘটনার পর তাঁর শিক্ষার দিক পাল্টে যায়।

একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে তাঁর পিতা দেখলেন, একদল মাদ্রাসার ছাত্র মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল সংগ্রহ করছে। সেই ছাত্রদের মাঝে তিনি নিজের ছেলেকেও খুঁজে পেলেন। পরদিনই পিতা ছেলেকে মাদ্রাসা থেকে বাড়ি এনে আবার স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। কারণ তাঁর কথা—ছেলে কোরানে হাফেজ হবে, কিন্তু ভিক্ষুক হবে না।

এর ফলে শহীদের স্কুলজীবন কিছুটা পিছিয়ে যায়। ১৯৭১ সালে তিনি ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র ছিলেন।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে যাওয়া প্রথম দিকের তরুণদের অন্যতম ছিলেন শহীদ। মুক্তিযুদ্ধে ফেনীর ফুলগাজীর জগতপুর গ্রামের নাম এক বিস্ময়। তখনকার প্রায় সকল তরুণই এই গ্রাম থেকে যুদ্ধের ময়দানে যোগ দিয়েছিল। জগতপুর পরিচিত ছিল বাড়িভিত্তিক পরিচয়ে—মজুমদার বাড়ি, ভুঁইয়া বাড়ি ইত্যাদি। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই একজন না একজন তরুণ দেশ স্বাধীন করতে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে গিয়েছিল। শুধু মজুমদার বাড়িতেই ছিলেন ৫০ জনের বেশি মুক্তিযোদ্ধা।

বিলোনিয়া ও সীমান্ত ক্যাম্প

দেশের ডাকে সাড়া দিয়ে যখন তাঁরা ভারত পাড়ি দেন, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ তাঁদের গ্রহণ করে। বিলোনিয়া সীমান্ত পেরিয়ে ওপারের পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠে তাদের ক্যাম্প। ট্রেনিং ছিল মাত্র তিন দিনের। কিন্তু প্রথম দিনেই ক্যাম্পের অর্ধেকের বেশি তরুণ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ছিটকে যায়। তৃতীয় দিনের শেষে দেখা গেল, মাত্র এক-তৃতীয়াংশ তরুণ টিকে আছে।

এটি ছিল ধারাবাহিক বহু ট্রেনিংয়ের প্রথম ধাপ। তাঁদের শেখানো হয় গ্রেনেড নিক্ষেপ আর এসকেএস রাইফেল চালানো। কারণ তখনও ভারত সরকার নিশ্চিত ছিল না—বাংলাদেশের তরুণেরা কতটা সংগঠিতভাবে যুদ্ধ করতে পারবে।

বিএসএফ তাঁদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেয়—কোনো অবস্থাতেই শত্রুর হাতে ধরা যাওয়া যাবে না। প্রয়োজনে অস্ত্র ফেলে পালিয়ে আসতে হবে। যুদ্ধের কৌশল হবে ‘হিট অ্যান্ড রান।’ সীমান্ত পেরিয়ে শত্রুর ঘাঁটিতে হানা দেওয়া, দূর থেকে আঘাত হানা—এটাই ছিল তাদের রণনীতি। মূল লক্ষ্য ছিল শত্রুকে জানিয়ে দেয়া—বাংলাদেশের তরুণেরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।

শহীদ যে ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, সেখানে দায়িত্বে ছিলেন বিএসএফের একজন মেজর; প্রশিক্ষণ দিতেন এক সুবেদার মেজর। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন—যুদ্ধে বাংলাদেশের তরুণদের জীবন সবচেয়ে মূল্যবান। যত কম প্রাণহানি হবে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তত বেশি থাকবে। যদিও পুরো বাংলাদেশে সব মুক্তিযোদ্ধা একই ট্রেনিং পাননি, আবার আবেগের অতিশয্যে অনেকে আধুনিক অস্ত্রধারী শত্রুর মুখোমুখি গিয়ে নিহত হন।

তৃতীয় পর্ব

ট্রেনিং শেষে শহীদ যখন গ্রামে ফিরে আসেন, তখন পাকিস্তানি সেনারা সীমান্ত এলাকায় ঘাঁটি গড়ছে। মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রবর্তী দল পরিচয় গোপন রেখে প্রথমে গ্রামে ফিরে আসে। তখন বাংলাদেশ সরকার গঠনের প্রস্তুতি চলছে। ফেনীতে বিদ্রোহী সেনা, ইপিআর-এর বাঙালি জওয়ান ও পুলিশের সদস্যরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তুলতে সীমান্তের দিকে চলে যাচ্ছেন। একসময় সেই বাহিনীর দায়িত্ব নেন মেজর জিয়া, পরে ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম।

পুরো যুদ্ধজুড়ে শহীদ ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা নিয়মিত বাহিনীর সদস্য হিসেবে নয়, গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে লড়াই করে যান। যুদ্ধের শুরুতেই শহীদ এক সাহসী কাজ করেন—বাড়িতে অস্ত্র মজুত রাখেন। তখন বাসায় তাঁর পিতা-মাতার পাশাপাশি এক বড় ভাই (যিনি স্বাস্থ্যগত কারণে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ না করলেও মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহায়তা করতেন), এক গর্ভবতী ভাবী এবং দুই তরুণী বোনও ছিলেন। এই অবস্থায় ধরা পড়লে পুরো পরিবারকেই গুলি করে হত্যা করা হতো।

তবে জগতপুর যেহেতু সীমান্তঘেঁষা এলাকা, পাকিস্তানিরা সহজে এখানে ঢোকার সাহস করত না। আবার ফেনী থেকে বিলোনিয়ার দিকে পাকিস্তানি কলভয় রওনা দিলে মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের শুভানুধ্যায়ী মানুষের কাছ থেকে আগেই খবর পেতেন। ফলে পুরো গ্রাম মুহুরি ও কোহুয়া নদী পেরিয়ে ওপারে নিরাপদে চলে যেতে পারত।

১৯৭১ সালের সেই তিন দিনের ক্যাম্প শহীদকে শুধু যুদ্ধশিক্ষাই দেয়নি—আরেকটি অভ্যাসও দিয়েছিল। তিনি সেখানে বিড়ি খাওয়ার অভ্যাস অর্জন করেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *