সম্প্রতি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি দাবি বারবার সামনে আসছে—“শাকসবজি ভিটামিনের প্রধান উৎস—এই ধারণা নাকি ভুল।” যুক্তিটি হলো, শাকসবজিতে ভিটামিন থাকলেও তা নাকি পর্যাপ্ত নয়, আরও বড় সমস্যা হচ্ছে এসব পুষ্টির শরীরে শোষণ ক্ষমতা কম। ফলে শাকসবজি বেশি খাওয়ার পরামর্শকে “স্ক্যাম” বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
এই বক্তব্যের ভিত্তি দাঁড় করানো হয়েছে দুটি প্রস্তাবের ওপর—
(১) শাকসবজিতে ভিটামিন-ডেন্সিটি তুলনামূলক কম,
(২) অ্যান্টিনিউট্রিয়েন্টের কারণে পুষ্টি শোষণ বাধাগ্রস্ত হয়।
দাবিদাতাদের মতে, ভিটামিনের টপ-১০ উৎস তালিকা খুঁজলে দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রাণিজ খাবারই এগিয়ে। ফলে মানুষের শরীর যে বায়োঅ্যাভেইলেবল পুষ্টি বেশি গ্রহণ করতে পারে—সেটা মূলত প্রাণিজ উৎস থেকেই আসে। তাদের বক্তব্য—শাকসবজি পুষ্টি জোগায়, কিন্তু সেগুলো ‘রেডি-টু-ইউজ ফর্মে’ না থাকায় শরীর তা সহজে ব্যবহার করতে পারে না। অপরদিকে মাংস, ডিম, মাছ—এসব খাবারের ভিটামিন-মিনারেল শোষণযোগ্যতায় স্বয়ংসম্পূর্ণ।
এই ব্যাখ্যা থেকে আরও একটি বড় দাবি উঠে আসে—
“প্রতিদিন ২০০–২৫০ গ্রাম লাল মাংস খেলে অধিকাংশ পুষ্টিহীনতা দূর হয়ে যায়।”
কারণ হিসেবে বলা হয়—লাল মাংসে রয়েছে কমপ্লিট প্রোটিন, প্রাণিজ ফ্যাট, হেম আয়রন, বিভিন্ন ভিটামিন-মিনারেল ও এনজাইম।
এ ধারার মতবাদ আরও বলে—শুধু শাকসবজি বা ‘সবজি–নির্ভর’ খাদ্যাভ্যাস মানুষের জন্য উপযোগী নয়। অতিরিক্ত শাকসবজি নাকি শারীরিক দুর্বলতা, আয়রন ঘাটতি, হরমোন সমস্যা, ত্বক–চুলের ক্ষতি বাড়াতে পারে। এর সাথে যোগ করা হয় কৃষিপণ্যে ব্যবহৃত আধুনিক রাসায়নিক ও হাইব্রিড জাতের উদ্বেগও। যুক্তি এমন—বেশি শাকসবজি উৎপাদন করতে গিয়ে প্রকৃতি নষ্ট হচ্ছে, আর বাজারে সহজলভ্য হলেও এসব সবজিতে প্রাকৃতিক পুষ্টির ঘনত্ব কমে গেছে।
এমন ব্যাখ্যায় পূর্বপুরুষদের খাদ্যাভ্যাসের কথাও তুলে ধরা হয়। তাদের খাদ্যে ছিল—
মাংস, মাছ, ডিম, ফল, মূল, বাদাম–বীজ এবং সামান্য মৌসুমি প্রাকৃতিক শাকসবজি।
দাবি করা হয়—মানুষের পরিপাকতন্ত্র সেই ধারার খাবারের সাথেই বেশি মানানসই। উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়—যেসব প্রাণী কাঁচা শাকসবজি খায়, তাদের পেট বিশাল; মানুষের পেট তুলনামূলক ছোট, তাই সে অধিক পরিমাণে ফাইবার–ভিত্তিক খাদ্যের জন্য নকশা করা নয়।
আরেকটি যুক্তির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়—ঘাস কেন এত প্রচুর জন্মে। লেখকদের মতে—ঘাসের সহজ জন্ম ও টিকে থাকা প্রমাণ করে প্রকৃতি মূলত পশুপালনের জন্যই তা রেখেছে, আর মানুষ সেই পশুর মাধ্যমে মাংস-চর্বি পেয়ে থাকে। ফলে প্রাণিজ পুষ্টিই নাকি মানুষের শক্তি, হরমোন, ত্বক-চুল, রোগপ্রতিরোধ—সবকিছুর জন্য শ্রেষ্ঠ উৎস।
এ ধারার সমালোচকেরা অবশ্য বিপরীত মত দেন—শাকসবজি যে পুষ্টিতে কম তা নয়; বরং ফাইবার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, পলিফেনল, ভিটামিন–মিনারেলের এক অনন্য উৎস। গবেষণায় দেখা যায়, মৌসুমি, দেশি ও নিরাপদ সবজি প্রতিদিন অল্প-পরিমাণে থাকলে দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বরং কমে। তবে অতিরিক্ত প্রসেসিং, কীটনাশক—এসব সত্যিই উদ্বেগের জায়গা, যা সতর্কতা দাবি করে।
বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্র তাই দুইটি—
(১) পুষ্টির ঘনত্ব বনাম শোষণক্ষমতা,
(২) আধুনিক কৃষি বনাম প্রাকৃতিক খাদ্যব্যবস্থা।
বিতর্কের মধ্যেও একটি বিষয়ে উভয় পক্ষই প্রায় একমত—শাকসবজি গুরুত্বপূর্ণ, তবে নিরাপদ, মৌসুমি ও পরিমিত হতে হবে। একইভাবে প্রাণিজ খাদ্যও পরিমিত রাখা জরুরি, কারণ খাদ্যবৈচিত্র্য না থাকলে পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক।
খাদ্যবিজ্ঞান ক্রমবর্ধমান; নতুন গবেষণা পুরোনো বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করে, আবার নতুন দৃষ্টিকোণও দেয়। তাই যেকোনো দাবিই—শাকসবজি হোক বা মাংস—অতিরঞ্জিতভাবে না দেখে পরিমিতি, বৈচিত্র্য ও বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে বুঝে নেওয়াই জরুরি।