সামসুল আরিফ বিপু
হাদীর মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আমাদের রাজনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার একটি প্রতীকী মুহূর্ত। এই মৃত্যু আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল—সহিংসতা দিয়ে কোনো সমাজকে এগিয়ে নেওয়া যায় না, বরং ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি গিয়ে দাঁড়ায় তরুণদের সামনে। কারণ বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত বাস্তবতায় ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীরা এখন সবচেয়ে বড় শক্তি। সংখ্যায়, কর্মক্ষমতায় এবং সম্ভাবনায়। কিন্তু সেই শক্তি কি সঠিক পথে ব্যবহৃত হচ্ছে?
বাংলাদেশে বহু বছর ধরে রাজনীতিক দলগুলো তরুণদের ব্যবহার করেছে, কিন্তু গড়ে তুলতে পারেনি। দলীয় পরিচয়ের নামে তরুণদের নামানো হয়েছে সংঘাতে, মারামারিতে, অন্ধ আনুগত্যে। বিনিময়ে তাদের দেওয়া হয়নি নিরাপদ শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান কিংবা ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। হাদীর মৃত্যু সেই নির্মম সত্যটাই আবার সামনে এনেছে।
এখন তরুণদের কাছে আহ্বান একটাই—ঐক্য। দলমত নির্বিশেষে ঐক্য। কারণ বিভক্ত তরুণ সমাজ মানেই দুর্বল বাংলাদেশ। শান্তিপূর্ণভাবে একত্র হওয়া, নিজের অবস্থান জানানো এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া—এই মুহূর্তে সেটাই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দায়িত্ব।
এই দেশে যারা বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ রক্ত দিতে জানে”—তাদের কাছে তরুণদের প্রশ্ন করা উচিত, আর কত? আর এই মূল্য কি তারা নিজেরা দিতে প্রস্তুত? প্রবাসে বসে যারা উস্কানি দেয়, তাদের উদ্দেশ্য নিয়েও তরুণদের সচেতন হওয়া জরুরি। কারণ সহিংসতার খেসারত দিতে হয় দেশে থাকা মানুষকেই—চাকরি, ভিসা, শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার মাধ্যমে।
একটি বাস্তব সত্য হলো—বাংলাদেশের পক্ষে ১১ কোটি তরুণের জন্য দেশে কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই তরুণদের বিশ্বমুখী হতে হবে। নিজেদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং বৈধ অভিবাসনের সুযোগ তৈরি করাই হওয়া উচিত জাতীয় অগ্রাধিকার। সহিংস রাজনীতি সেই পথ বন্ধ করে দেয়।
জনমিতির বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরেই বলছেন, তরুণ জনসংখ্যার ডিভিডেন্ড কাজে লাগাতে পারলে ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নতির সূচকে বড় অগ্রগতি অর্জন করতে পারে। কিন্তু সময় খুবই কম—আর মাত্র এক দশক। এই সময় যদি হানাহানি, প্রতিশোধ আর ক্ষমতার খেলায় নষ্ট হয়, তাহলে ক্ষতিটা হবে অপূরণীয়।
হাদীর মৃত্যুর শোককে শক্তিতে রূপান্তর করার পথ আছে। সেটি সহিংসতা নয়। সেটি হলো—উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা, মানবিক রাজনীতি, দালালমুক্ত সমাজ, যোগ্যতার ভিত্তিতে সুযোগ এবং শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। তরুণদের সেই পথেই দাঁড়াতে হবে।
সবশেষে তরুণদের উদ্দেশে একটি কথা—এই দেশটা শেষ পর্যন্ত তোমাদেরই। জেন জি, জেন ওয়াই—বাংলাদেশ এখন তোমাদের হাতেই। রাজনীতির বাইরে গিয়ে, পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে, শান্তির পক্ষে দাঁড়িয়ে তোমরাই দেখাতে পারো—এই দেশ আর রক্তপাত চায় না।