বেগম খালেদা জিয়া—এক আপোষহীন নেতৃত্বের অবসান

মারুফ আহমেদ

সবাইকে চিরতরে বিদায় জানিয়ে নীরবে, নিভৃতে, একা চলে গেলেন আপোষহীন নেত্রী—দেশনেত্রী খ্যাত বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর মৃত্যুতে দেশজুড়ে সাধারণ ছুটিসহ তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হচ্ছে।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, “জাতি এক মহান অভিভাবক হারাল। তাঁর মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে শোকাহত ও মর্মাহত।” এই অপূরণীয় ক্ষতির দিনে তিনি দেশবাসীকে শান্ত ও ধৈর্যশীল থাকার আহ্বান জানান। দোয়া ও প্রার্থনা করার অনুরোধ করেন। একই সঙ্গে শোকসন্তপ্ত পরিবার ও দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

বুধবার (৩১শে ডিসেম্বর) মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা সংলগ্ন স্থানে তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি মেজর জিয়াউর রহমানের সমাধিস্থলের পাশে তাকে দাফন করা হয়।

মৃত্যুর অনেক আগেই দেশনেত্রী বলে গিয়েছিলেন—“এই দেশে আমার জন্ম, এই দেশেই আমার মৃত্যু হবে। এই দেশের মানুষের মাঝেই আমি বেঁচে থাকতে চাই।” মানুষের মনের চাহিদার মতো করেই সেই সুযোগটি তিনি পেলেন। এই দেশ, এই মাটি ও এই মানুষের মাঝেই অম্লান হয়ে থাকবেন বেগম জিয়া—স্মৃতি, সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস ও মানুষের ভালোবাসার মিশেলে। মিথ্যা মামলায় ২৫ মাসের কারাবাসে জীবনের বহু অধ্যায় বিপন্ন করে অবশেষে তিনি মুক্তি নিলেন জীবনের মামলা থেকে—সবাইকে কাঁদিয়ে।

বিগত দিনগুলোতে জাতির প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে মিশে ছিল উৎকণ্ঠা। ২৫ নভেম্বর থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি নানা জটিল রোগের সঙ্গে লড়াই করছিলেন। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অকুতোভয় লড়াই যাঁকে কোটি মানুষের মনে স্থায়ী আসন করে দিয়েছিল, তাঁর সেই গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ মিলেছে আজ—চোখের অশ্রুতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অগণিত মানুষের নীরব কান্নায়, রাজনৈতিক সহযাত্রীদের শোকে। সেই শোক যেন সবাইকে পাথর করে দিয়েছে।

বাংলাদেশের মতো একটি অস্থিতিশীল দেশে, যেখানে রাজনীতিকে অনেক সময় কেবল ক্ষমতার দখলের লড়াই হিসেবে দেখা হয়, সেখানে ত্যাগ ও ধৈর্যের মহিমায় তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিষ্ঠাবান। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের রাজনৈতিক হিংসার প্রভাবে বেগম জিয়াকে একসময় সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ করে তোলা হয়। নিজের দল ও পরিবার থেকেও তাঁকে এমনভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, যা পাঠকের অজানা নয়। “বালুর ট্রাকের গল্প” ও “গোপালী সংলাপ”—এই দুই অধ্যায় এ দেশের মানুষ জন্মজন্মান্তর মনে রাখবে।

নিজের জীবনের বিনিময়ে বেগম খালেদা জিয়া দেখিয়েছেন—জেল, অবহেলা, অপমান, মিথ্যা সাজানো মামলা এবং শেষপর্যন্ত কঠিন অসুস্থতার মধ্যেও কীভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়। গৃহিণী থেকে একটি দেশের কাণ্ডারি হয়ে ওঠা বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী তিনি। একই সঙ্গে একজন মা, একজন নেত্রী। দেশকে ভালোবেসে পুরো রাজনৈতিক জীবনে শত জুলুম নিরবে সহ্য করেছেন বলেই নিঃসন্দেহে বলা যায়—এমন নেত্রী শত জন্মে একজন জন্মান।

মঙ্গলবার (৩০শে ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। ২০১৪ সালের জুনে তাঁর হৃদ্‌যন্ত্রে পেসমেকার বসানো হয়। এর আগে, গত ২৩শে নভেম্বর ফুসফুসের সংক্রমণ থেকে শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। নিউমোনিয়া, কিডনি রোগ, লিভার জটিলতা, আর্থ্রাইটিস ও ডায়াবেটিসসহ একাধিক পুরোনো রোগে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যায় রাখা হয়।

এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দেশনেত্রীর একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। রাজনীতির অধ্যায় শেষ হলেও দেশের মানুষের হৃদয়ে বেগম খালেদা জিয়া চির অমর। এই শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। নির্বাচনী সাফল্য ও দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসে তাঁর প্রস্থান রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি শুধু একটি দলের নন—পুরো দেশের মানুষের হৃদয়ে ছিলেন একটি ফুলের মতো । জাতি আজ যেন অভিভাবকশূন্য। গণতন্ত্র রক্ষা ও মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে অবিচল এই নিষ্ঠাবান মা জাতির কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এই মৃত্যু শোকের, আবার গর্বেরও। বিদায়—মাদার অব ডেমোক্রেসি।

স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু ও ফ্যাসিস্ট সরকারের হয়রানিমূলক মামলায় শেষ জীবনে যাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতে দেওয়া হয়নি, সেই মানুষটিই আজ ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়। দৃঢ়চেতা, আপোষহীন ঐক্যের প্রতীক বেগম খালেদা জিয়ার বর্ণিল জীবনের গল্প লিখে শেষ করা যাবে না।

সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি ও রাজনৈতিক পথচলা

বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের জলপাইগুড়ি জেলায়। গ্রামের বাড়ি ফেনীর ফুলগাজীতে। পিতা ইস্কান্দার মজুমদার, মাতা তৈয়বা মজুমদার। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে দিনাজপুরের মুদিপাড়ায়। ১৯৬০ সালে দিনাজপুর সরকারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরে দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ সরকারি কলেজে ভর্তি হন।

কলেজে পড়ার সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। ১৯৬৫ সালে স্বামীর সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানে যান এবং ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত করাচিতে অবস্থান করেন। পরে ঢাকায় ফিরে জয়দেবপুর ও চট্টগ্রামের ষোলশহরে বসবাস করেন। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় দুই পুত্র—তারেক রহমান পিনু ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকো।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবারটি আত্মগোপনে ছিল। ১৯৭১ সালের ২রা জুলাই সিদ্বেশ্বরীর একটি বাসা থেকে দুই সন্তানসহ বেগম খালেদা জিয়াকে বন্দি করা হয় এবং ১৫ই ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে আটক রাখা হয়। ১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে বিপথগামী সেনাসদস্যদের হাতে শহীদ হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

স্বামীর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন একজন গৃহিণী। পরে নেতাকর্মীদের আহ্বানে ভঙ্গুর বিএনপির হাল ধরেন। ধীরে ধীরে নীতি ও আদর্শের পথে এগিয়ে গিয়ে আপোষহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিতি পান। তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। একটানা ৪১ বছর নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮৪ সালে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন মনোনীত হন এবং একই বছর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে দুর্বার গণআন্দোলন। ১৯৯১ সালে তাঁর নেতৃত্বেই বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসে। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তিনি আবারও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। সার্কের চেয়ারপারসনের দায়িত্বও পালন করেন দুইবার।

নির্বাচনী রাজনীতিতে তাঁর সাফল্য ছিল অভূতপূর্ব। পাঁচটি সংসদ নির্বাচনে ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতিটিতেই বিজয়ী হন। ওয়ান-ইলেভেনের সময় গ্রেপ্তার, কারাবাস, নির্বাসনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান—সবকিছুই মোকাবিলা করেছেন দৃঢ়তায়। ২০১০ সালে ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে উচ্ছেদের ঘটনাও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক বেদনাদায়ক অধ্যায়।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন কোনোভাবেই ফেলনা নয়। দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি ছিলেন নির্বাচনের মাঠে সক্রিয় এক শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব। অসুস্থতা ও মামলার কারণে শেষ দিকে নির্বাচন করতে না পারলেও গণতন্ত্রের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল অনড়।

আজ তিনি নেই। কিন্তু ইতিহাসে, রাজনীতিতে এবং মানুষের ভালোবাসায় বেগম খালেদা জিয়া থাকবেন চিরদিন। পৃথিবীর সব কোলাহল থাকবে—শুধু তিনি থাকবেন স্মৃতির গভীরে, নীরব অথচ অমলিন।

লেখক: সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *