চিরবিদায় দেশনেত্রী: এক শুভ্রতা ও সংগ্রামের মহাপ্রয়াণ

সামসুল আরিফ বিপু

বাংলার আকাশের রাজনীতিতে যে নক্ষত্রটি দীর্ঘকাল ধরে আপসহীন সংগ্রাম আর মাতৃত্বের শীতল ছায়া হয়ে টিকে ছিল, সেই বেগম খালেদা জিয়া আজ চিরনিদ্রায় শায়িত। তাঁর প্রস্থান কেবল একজন নেত্রীর প্রস্থান নয়, বরং একটি আদর্শিক স্তম্ভের মহাপ্রয়াণ। তিনি এমন এক নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন, যেখানে ক্ষমতা শাসনের হাতিয়ার নয়, বরং তা হয়ে উঠেছিল এক বিশাল জনগোষ্ঠীর নিরাপদ আশ্রয় এবং সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী।

যিনি এদেশকে কারাগার বানানোর রাজনীতিতে বিশ্বাস করেননি, তাঁর বিদায়ে আজ প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের চোখে জল। বিশ্বরাজনীতির জটিল মেরুকরণ ও আদর্শিক সংঘাতের মাঝেও তিনি এদেশের মানুষের সার্বভৌমত্ব ও ধর্মীয় অনুভূতিকে কখনো বিকিয়ে দেননি। তাঁর ব্যক্তিত্বে যে আভিজাত্য ছিল, তা এদেশের মানুষের কাছে ছিল মায়ের আঁচলের মতো নিরাপদ এক আশ্রয়স্থল।

সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের পরতে পরতে মিশে ছিল তাঁর ওপর হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ। জরাজীর্ণ কারাপ্রকোষ্ঠে তাঁর ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুযন্ত্রণা সহ্য করা দেখে এদেশের মানুষ যে দ্রোহের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়েছিল, তাই শেষ পর্যন্ত এক ভয়াবহ স্বৈরশাসনের পতন ঘটিয়েছে। তাঁর নিঃশব্দ সংগ্রামই ছিল রাজপথের উত্তাল স্লোগানের নেপথ্য শক্তি।

কাদা-ছোড়াছুড়ির রাজনৈতিক সংস্কৃতির ঊর্ধ্বে থেকে তিনি সবসময় এক অনুকরণীয় শালীনতা বজায় রেখেছেন। তাঁর আচরণে কোনো হীনম্মন্যতা ছিল না; নারী হিসেবে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেওয়া কিংবা নিজের ধর্মীয় পরিচয়কে সাহসের সাথে ধারণ করা—সবক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি আমাদের দেখিয়েছেন, কীভাবে রাজনীতির ময়দানে থেকেও একজন মানুষ নিজের আদর্শ ও মর্যাদায় অটুট থাকতে পারেন।

আজকের এই বিদায়লগ্নে দাঁড়িয়ে এ জাতি সাক্ষী দিচ্ছে, যারা তাঁকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে, ইতিহাস তাদের ক্ষমা করেনি। তারা আজ জনবিচ্ছিন্ন ও ধিকৃত। পক্ষান্তরে, বেগম খালেদা জিয়া আজ কোনো নির্দিষ্ট দলের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; তিনি হয়ে উঠেছেন এদেশের আপামর জনতার।

পদ্মা-মেঘনার স্রোতধারা যেমন চিরন্তন, তাঁর ত্যাগের মহিমাও বাংলাদেশের ইতিহাসে তেমনি অমলিন থাকবে। যে শুভ্রতা তিনি ছড়িয়ে গেছেন, তা আগামী প্রজন্মের রাজনীতিকদের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *