সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিকে আঞ্চলিক সংহতির শক্ত বার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, “গতকালের জানাজায় আমরা প্রকৃত সার্কের চেতনা দেখেছি। সার্ক এখনো বেঁচে আছে, এর চেতনা এখনো জীবিত ও দৃঢ়।”
প্রফেসর ইউনূস জানান, বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম নারী সরকারপ্রধান হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সার্কভুক্ত দেশগুলো যে সম্মান দেখিয়েছে, তাতে তিনি গভীরভাবে অভিভূত। তাঁর মতে, এই উপস্থিতি শুধু শোক প্রকাশ নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ঐক্য ও সহযোগিতার প্রতীক।
ঢাকায় অনুষ্ঠিত জানাজায় দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মা, শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র, কর্মসংস্থান ও পর্যটনমন্ত্রী বিজিথা হেরাথ এবং মালদ্বীপের উচ্চশিক্ষা ও শ্রমমন্ত্রী আলী হায়দার আহমেদ।
জানাজা শেষে পাকিস্তানের সংসদীয় স্পিকার এবং নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের মন্ত্রীরা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকগুলোতে তাঁরা প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং গণতন্ত্রের জন্য তাঁর আজীবন সংগ্রাম ও দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সহযোগিতা বৃদ্ধিতে তাঁর ভূমিকার কথা স্মরণ করেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, জানাজায় রেকর্ডসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে, সাধারণ মানুষ তাঁকে কতটা ভালোবাসতেন। শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তিনি বলেন, “গতকাল সার্ক সক্রিয় ছিল। আমরা একসাথে আমাদের দুঃখ ভাগ করে নিয়েছি।”
সবকটি বৈঠকেই প্রফেসর ইউনূস দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা—সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। মালদ্বীপের মন্ত্রী আলী হায়দার আহমেদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, জানাজায় যে ঐক্যের চিত্র দেখা গেছে, সেটিই সার্কের প্রকৃত চেতনা। তিনি নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাইডলাইনে সার্ক নেতাদের একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক আয়োজনের পূর্ব প্রচেষ্টার কথাও স্মরণ করেন। তাঁর ভাষায়, “পাঁচ মিনিটের জন্য হলেও সার্ক নেতাদের একত্র করতে চেয়েছিলাম।” দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষের জন্য সার্ক একটি অর্থবহ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আবার সক্রিয় হবে—এমন আশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
বৈঠকগুলোতে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়েও আলোচনা হয়। প্রধান উপদেষ্টা জানান, বাংলাদেশ ১২ ফেব্রুয়ারি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। নির্বাচন শেষে তিনি তাঁর পূর্বের পেশাগত ভূমিকায় ফিরে যাবেন বলেও পাকিস্তানের সংসদীয় স্পিকারকে অবহিত করেন।
এ ছাড়া শ্রীলঙ্কা ও নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বাংলাদেশের প্রবাসী ভোটারদের জন্য ডাকযোগে ভোটদানের ব্যবস্থা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানান। প্রফেসর ইউনূস বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রথমবারের মতো এই ব্যবস্থা চালু করার পর বিদেশে বসবাসকারী ও কর্মরত প্রায় সাত লাখ বাংলাদেশি পোস্টাল ব্যালটের জন্য নিবন্ধন করেছেন। এ বিষয়ে শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিথা হেরাথ বলেন, “আমরা আপনাদের এই অভিজ্ঞতা থেকে শিখব।”
এই সফর ও বৈঠকগুলোকে কেন্দ্র করে ঢাকায় যে আঞ্চলিক সংহতির বার্তা উঠে এসেছে, তা সার্ক পুনরুজ্জীবনের আলোচনাকে নতুন করে সামনে এনেছে।