পুতুল থেকে প্রধানমন্ত্রী: দিনাজপুরে গড়া খালেদা জিয়ার শৈশব

 

বিজয় মজুমদার

সদ্য দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়া এই মহীয়সী নেত্রীর আসল নাম খালেদা খানম। ডাকনাম পুতুল।

আমার এক নানীর তিনি ছিলেন স্কুলজীবনের সহপাঠী। নানীর ভাষ্য অনুযায়ী, ছোটবেলায় দেখতে পুতুলের মতো সুন্দর ছিলেন বলেই হয়তো তাঁর নাম রাখা হয়েছিল পুতুল। তবে শুধু রূপ নয়, স্বভাবেও তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম।

খালেদা খানম ছিলেন ক্লাসের সবার প্রিয়। স্কুলের শিক্ষকদেরও প্রিয় ছিলেন তিনি। পড়ালেখায় অসাধারণ বলে নয়, কিংবা পুতুলের মতো চেহারার কারণে নয়—তাঁর নম্রতা, শান্ত স্বভাব এবং ভদ্র আচরণই তাঁকে আলাদা করে তুলেছিল। শিক্ষকদের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। স্কুলে নিয়মিত যেতেন। বন্ধুদের সঙ্গে মিশতেও তাঁর কোনো সংকোচ ছিল না।

সে সময় দিনাজপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয় শুধু মেয়েদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং দিনাজপুর জেলার অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ হিসেবে পরিচিত ছিল। সেখানে পড়াশোনা করত মূলত শহরের মান্যগণ্য পরিবারের সন্তানরা। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের সামাজিক আভিজাত্যের চর্চাও ছিল। কিন্তু ভবিষ্যতে যিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন, তাঁর আচরণে কোনো দিনই সেই সম্ভাবনার আভাস পাওয়া যায়নি।

খালেদা খানম ছিলেন এতটাই চুপচাপ ও শান্ত যে তাঁর স্কুলের বন্ধুরা নাকি কখনো কল্পনাও করতে পারেনি—এই ‘পুতুল’ একদিন দৃঢ় হাতে একটি দেশ পরিচালনা করবেন।

যদিও জন্ম জলপাইগুড়ির নয়াবস্তিতে, দেশবিভাগের বাস্তবতায় বেগম খালেদা জিয়ার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে দিনাজপুর শহরেই। সে অর্থে দিনাজপুরই ছিল তাঁর নিজের শহর। উইকিপিডিয়ায় উল্লেখ আছে, তাঁর পিতা ইস্কান্দার মজুমদার দিনাজপুরে এসে মুদিপাড়ায় বসবাস শুরু করেন। তবে মামাবাড়ির পারিবারিক ভাষ্য অনুযায়ী, জলপাইগুড়ি থেকে আসার পর তাঁরা প্রথমে মামাদের বাড়িতে উঠেছিলেন। সে এলাকার নাম ছিল ঈদগাহবস্তি।

পরবর্তীতে ইস্কান্দার মজুমদারের পরিবার দিনাজপুর শহরের মুদিপাড়ায় স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলে। মুদিপাড়ার যে বাড়িটিতে কেটেছে খালেদা জিয়ার শৈশব-কৈশোর, সেই বাড়িটির মালিক ছিলেন এক হিন্দু ভদ্রলোক—ফণি ভূষণ ঘোষ। দুইতলা বিশিষ্ট এই বাড়ির দ্বিতীয় তলায় বসবাস করতেন মজুমদার পরিবার।

বাড়িটি দিনাজপুর আদর্শ কলেজের প্রধান ফটকের ঠিক বিপরীত দিকে অবস্থিত। বর্তমানে বাড়িটির নাম ‘মাতৃছায়া’। আশ্চর্যের বিষয়, সময়ের দীর্ঘ প্রবাহেও বাড়িটির কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। যে সময় ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী এখানে বসবাস করতেন, আজও বাড়িটি অনেকটা সেই স্মৃতিরই ধারক।

এই মুদিপাড়ার বাড়িতেই ঘটেছিল এমন এক ঘটনা, যা পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের বীজ রোপণ করে। এই বাড়িতে বসবাসকালেই খালেদা খানমের বিয়ে হয় তৎকালীন এক তরুণ সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে। পদমর্যাদায় তিনি তখন ছিলেন ক্যাপ্টেন।

এই তরুণ সামরিক অফিসার জিয়াউর রহমানই পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের এক বীর সেনানী হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন। তিনি শুধু বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সেনাপ্রধানই হননি, হয়েছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিও। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে জেড বাহিনীর প্রধান, বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত শহীদ রাষ্ট্রপতি ।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর খালেদা জিয়ার পিতা ইস্কান্দার মজুমদার দিনাজপুর শহরের বালুবাড়ী এলাকায় জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করেন। সেই বাড়িটির নাম রাখা হয় ‘তৈয়বা ভিলা’।

যদিও বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম দিনাজপুরে নয়, তবু তাঁর শৈশব ও কৈশোরের প্রায় পুরোটা সময় কেটেছে এই শহরেই। আর সেই সময়ের বড় একটি অধ্যায় জুড়ে ছিল মুদিপাড়ার সেই বাড়িটি—আজকের মাতৃছায়া।

বর্তমান বাসিন্দারা সচেতনভাবেই বাড়িটিকে সেই সময়কার অবস্থার কাছাকাছি রেখে দিয়েছেন, যে সময় খালেদা জিয়া এখানে বসবাস করতেন। এখনো তাঁর আত্মীয়স্বজন কিংবা ঘনিষ্ঠ কেউ কেউ এই বাড়িতে বেড়াতে আসেন।

তাঁদের উপস্থিতিতে যেন বাড়িটিও ফিরে যায় অতীতে। ফিরে যায় সেই সময়ে, যখন এক কিশোরীর পদচারণায় মুখর হয়ে উঠত এই দুইতলা বাড়ি—যে কিশোরী একদিন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেশের ইতিহাসে নিজের নাম লিখে যাবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *