রাজনীতি, ক্ষমতা আর ক্রিকেট: মুস্তাফিজুর রহমান কি অকারণ বলি?

বিজয় মজুমদার 

ক্রিকেটকে আমরা বরাবরই মাঠের খেলা বলে জানতে চাই। কিন্তু বাস্তবে, অনেক সময়ই এই খেলাটিও রাজনীতি ও ক্ষমতার অদৃশ্য টানাপোড়েন থেকে মুক্ত থাকে না। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আবারও সে কথাই মনে করিয়ে দিল।

আমরা সাকিব আল হাসানকে দল থেকে বাদ দিয়েছি। ভারত আইপিএলে মুস্তাফিজুর রহমানের খেলা কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ যদি কেবল পারফরম্যান্সই বিচার্য হতো, তাহলে সাকিবকে বাদ দেওয়ার প্রশ্নই উঠত না। আর যদি ন্যায়ের কথা সামনে আসত, তাহলে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড—বিসিসিআই—মুস্তাফিজকে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারত না।

কারণটা স্পষ্ট। বিসিসিআইয়ের অনুমতিক্রমেই মুস্তাফিজকে আইপিএলের নিলামে তোলা হয়েছিল। সেই নিলামে অন্য দলগুলোর সঙ্গে বিড করেই কেকেআর তাঁকে দলে নিয়েছে। এখানে নিয়মভঙ্গ কোথায়? তবু এখন দায় এসে পড়ছে শাহরুখ খান ও কেকেআরের ঘাড়ে।

অভিযোগের সূত্রপাত ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে। এরপর সেই অভিযোগকে ভিত্তি করে বিসিসিআই কেকেআরকে জানায়—বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে, তাই মুস্তাফিজকে দল থেকে বাদ দিতে হবে। বিষয়টি এখানে এসে আরও জটিল ও কৌতূহলোদ্দীপক হয়ে ওঠে।

কারণ পৃথিবীর এমন কোনো রাষ্ট্র কার্যত নেই, যার বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ কখনো ওঠেনি। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে এ ধরনের অভিযোগে সাধারণত কোনো খেলোয়াড়কে নয়, বরং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রকেই শাস্তি বা বহিষ্কারের মুখে পড়তে হয়। অভিযোগ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে, কিন্তু তীরবিদ্ধ হলেন একজন ক্রিকেটার—মুস্তাফিজুর রহমান।

এটাই প্রথম নয়। এর আগেও মুস্তাফিজ আইপিএল খেলেছেন সাফল্যের সঙ্গে। সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদকে টুর্নামেন্ট জিততে সাহায্য করেছেন। তখন এসব অভিযোগ নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা হয়নি। এমনকি যখন শেখ হাসিনা ক্ষমতায় ছিলেন, তখনও বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল। প্রিয় বালা সাহা নামে বাংলাদেশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন সেই অভিযোগ খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছেও উত্থাপন করেছিলেন। তবু ভারত তখন আইপিএলে মুস্তাফিজের খেলা বন্ধ করেনি।

এরপর মুস্তাফিজ খেলেছেন মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স, রাজস্থান রয়্যালস, দিল্লি ক্যাপিটালস ও চেন্নাই সুপার কিংসের হয়ে। প্রশ্ন হলো, তখন যদি সমস্যা না থাকে, এখন কেন?

স্পষ্টতই, দুটি দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের শিকার হলেন বাংলাদেশের অন্যতম ভদ্র ও শান্ত ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমান। যিনি মাঠের বাইরে কখনোই বিতর্কের জন্ম দেননি, যিনি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য বা অবস্থানের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেননি।

রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের দায়ে কোনো খেলোয়াড়কে বহিষ্কার করা যায় একমাত্র তখনই, যখন রাষ্ট্র নিজেই নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করে এবং সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড় সেই বৈষম্যমূলক সরকারের পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যান। মুস্তাফিজুর রহমানের ক্ষেত্রে এমন কোনো অভিযোগ নেই।

একজন সত্যিকারের চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড়কে এভাবে বাদ দেওয়া শুধু ক্রিকেটের স্পিরিটের পরিপন্থী নয়, তা নিজের তৈরি নিয়ম ও আইনের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। ক্রিকেট যদি সত্যি মাঠের খেলাই হয়, তবে মাঠের বাইরের রাজনীতির বোঝা একজন খেলোয়াড়ের কাঁধে চাপানো অন্যায়।

আশা করা যায়, ক্রিকেটের স্বার্থে ভারতের ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে। মুস্তাফিজুর রহমানকে তাঁর প্রাপ্য জায়গায় ফেরার সুযোগ দেবে। আর ক্রিকেট—আরও একবার কলঙ্কমুক্ত থাকার সুযোগ পাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *