দেশে বর্তমানে ৩৩৫টি জেনেরিক নামে প্রায় ৮১০০টি বাণিজ্যিক বালাইনাশক বাজারে রয়েছে। এসব বালাইনাশক প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ায় হাওরাঞ্চলে বালাইনাশক নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
রোববার (৪ জানুয়ারি) মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় কমিটির দ্বিতীয় সভায় এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার।
সভায় জানানো হয়, হাওর অধ্যুষিত সাতটি জেলায় আসন্ন বোরো মৌসুমে বালাইনাশক বিক্রি ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে নজরদারি জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে বালাইনাশকের বোতল ও প্যাকেটে সহজ ও স্পষ্ট বাংলায় ব্যবহার নির্দেশিকা সংযুক্ত করা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
ফরিদা আখতার বলেন, বর্ষা শেষে পানি কমে গেলে হাওরাঞ্চলে বোরো ধান চাষ শুরু হয়। বেশি ফলনের আশায় অনেক কৃষক প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বালাইনাশক ব্যবহার করছেন। এতে মাছ, গবাদিপশু ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জরুরি ও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয়, হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য বালাইনাশকের নিরাপদ ও সঠিক ব্যবহার বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম চালু করা হবে। খাদ্য ও পশুখাদ্যে বালাইনাশকের বিষক্রিয়া পরীক্ষার জন্য এনআইবি, বিসিএসআইআর ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) ল্যাবরেটরিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ক্ষতিকর রাসায়নিকের বিকল্প হিসেবে জৈব বালাইনাশক, ইন্টিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্ট (আইপিএম) এবং গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস (জিএপি) কার্যক্রম জোরদারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। হাওর অঞ্চলে বালাইনাশক নিয়ন্ত্রণে একটি সমন্বিত ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ আগামী ৩১ জানুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোকাব্বির হোসেন বলেন, কার্বোফুরান নামের ক্ষতিকর বালাইনাশক ইতিমধ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এটি যাতে বাজারে না আসে, সে বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, বালাইনাশক ব্যবহারের বিধিমালা চূড়ান্ত হলে নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হবে। স্বাস্থ্য সচিব মো. সাইদুর রহমান বালাইনাশক বিক্রিতে প্রেসক্রিপশন পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব দেন।
মাঠপর্যায়ের গবেষণা ও নাগরিক গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষক সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, শুধু ফলনের দিকে নজর দিলে এবং বিষক্রিয়ার প্রভাব উপেক্ষা করলে কৃষি উৎপাদন, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ—সবই দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সরকার জানিয়েছে, কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মানুষের জীবন ও পরিবেশ রক্ষা করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।